দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের রাজনীতি

জনদাবি যখন রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়, তখন নতুন গল্পের প্রয়োজন হয় না। একই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে অন্য একটি তথ্য সামনে এনে, অগ্রাধিকার বদলে দেওয়া যায়। সত্য তথ্যের বিন্যাস প্রক্রিয়া জনপরিসরের প্রশ্ন বদলে দিতে পারে। সালমান মুক্তাদিরের ঘটনা সাম্প্রতিক উদাহরণ। তার স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর সালমান প্রকাশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন এবং হামলার সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। পরে পুলিশ ঘটনার পেছনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কথা জানিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট  দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সালমানের ব্যাংক হিসাব, KYC ও লেনদেনের তথ্য দিতে বলে। পরদিন রাতে অভিযান হয় তার শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের Toss Bond-এর গুদামে। চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়। কর্তৃপক্ষ সেখানে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য সংরক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ জানায়। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ব্যাংক-তথ্য চাওয়া কিংবা Toss Bond-এ অভিযান-হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। হামলায় কারা গেল, কেন গেল, কারা যুক্ত, তদন্ত কোথায় এসবের সঙ্গে আলোচনার বিষয় হয়েছে আক্রান্ত ব্যক্তির আর্থিক পরিসর এবং পারিবারিক ব্যবসা। এর ফলে আইন প্রয়োগের ফল, আইনি নথির বাইরে সংবাদচক্রে নতুন বিন্যাস তৈরি করে। কোনো নাগরিক একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করার পর, অল্প সময়ের ব্যবধানে তার আর্থিক তথ্য এবং পারিবারিক ব্যবসা আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলে, হামলার বিষয়টি প্রধান ফোকাস থাকে না। 

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে বয়ান-পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। ১৮ সেপ্টেম্বর অপ্রতিম নিখোঁজ, ১৯ সেপ্টেম্বর মরদেহ উদ্ধারের পর ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল পুলিশ। শিশুটিকে খুঁজে বের করতে কী করা হয়েছিল, পুলিশ সুপার কোথায় ও তদন্ত কোথায়? সুপারের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল।

পরবর্তী সময়ে পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনের পর আলোচনার অভিমুখ বদলে যায়। অপ্রতিম কীভাবে খুন হলো এই প্রশ্নের সঙ্গে যোগ হলো অপ্রতিম কার সঙ্গে মিশত, তার কাছে কেন আইফোন ছিল, সে টিকটক করত কি না, বয়সে বড় ছেলেদের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক ছিল! পুলিশ সুপার সেই সম্পর্ককে বলেন ‘অসম বন্ধুত্ব’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপ্রতিমের সঙ্গে ওই তরুণদের ‘ওঠাবসা’ ও ‘বন্ধুত্বে¡র’ কথা বললেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী বললেন, বাবা-মায়ের দায়িত্ব সন্তানের চলাফেরা ও ‘বন্ধু সার্কেল’ দেখা। সময় ও বক্তব্যের অভিমুখ পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, হত্যাকারীর কাজের সঙ্গে নিহত শিশুর জীবনযাপন দ্রুত জনআলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ২১ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিকের শিরোনামে উঠে আসে  “আইফোন, ৫ হাজার টাকার পাওনা ও ‘অসম বন্ধুত্ব”’। আইফোন, যোগাযোগ, ছবি বা কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল এসব তদন্তের উপাদান হতে পারে। কিন্তু ‘একসঙ্গে চলাফেরা’ থেকে ‘বন্ধুত্ব’, আর সেখান থেকে ‘অসম বন্ধুত্ব’ এই ভাষান্তরের সঙ্গে একটি নৈতিক মূল্যায়ন যুক্ত হয়। অপ্রতিমের বয়স ছিল ১৩। সে আইফোন ব্যবহার করত, টিকটক করত, বাইক চালাত, বাইরে যেত- এসব তথ্য কতটুকু সত্য, সে আলোচনায় যাচ্ছি না। এসব তথ্য হত্যার দায় তার দিকে ফেরায় না। ২৩ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের মা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, তার ‘দুধের বাচ্চাকে’ কেন ভিক্টিম ব্লেমিং করা হচ্ছে। তদন্তের তথ্য যখন নিহত শিশুর জীবনযাপনের বিচার শুরু হয়, তখন অপরাধীর কাজের বদলে ভুক্তভোগীর জীবন ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অপ্রতিম কী করত, তার চেয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন ছিল তাকে কে হত্যা করেছে, কীভাবে করেছে এবং পুলিশ কীভাবে সেই হত্যার তদন্ত করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের সরকারি তথ্যচিত্রে ভিন্ন রূপ দেখা গেছে। ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনাপ্রবাহ ও অবদান যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় দুঃখ প্রকাশ করে এবং তথ্যচিত্র সংশোধনের কথা জানায়। সরকার যখন গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস নিজের আয়োজনে বর্ণনা করে, তখন শুধু ঘটনাগুলোর তালিকা তৈরি করে না। কোন ঘটনা আগে আসবে, কার ভূমিকা দৃশ্যমান হবে, কোন অবদান আড়ালে থাকবে স্মৃতির ক্রমও তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সংকটের সরকারি ব্যাখ্যায় আরেক রূপ দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, চলমান সংকটের বড় অংশ আগের সরকারের ভুল নীতি, আমদানিনির্ভরতা ও জাতীয় সক্ষমতা গড়ে না তোলার ফল। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এই সংকটের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নেই।

সংকট থাকে বর্তমানে। দায় চলে যায় অতীতে। ঘটনাগুলো এক নয়। কিন্তু বয়ানের কাজ এক জায়গায় এসে মিলে। দৃশ্যমান কোনো ঘটনার পাশে আরেকটি তথ্য দাঁড় করালে, জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে মোড় নেয়। হত্যাকাণ্ডের পাশে নিহতের ব্যক্তিজীবন। হামলার পাশে আক্রান্ত ব্যক্তির আর্থিক ও পারিবারিক পরিসর। বর্তমান সংকটের পাশে অতীত সরকারের দায়। তখন কিন্তু ঘটনা অদৃশ্য হয় না। চারপাশে জমা হয় নতুন প্রশ্ন। কে হত্যা করল, তার পাশে আসে কে, কাদের সঙ্গে মিশত, কারা হামলা করল? একই সঙ্গে আসে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ও শ্বশুরের ব্যবসা। আজকের সংকট কীভাবে সামলানো হচ্ছে,  তার পাশে দৃশ্যমান হয় আগের সরকার কী রেখে গেছে। রাষ্ট্রীয় বয়ানের শক্তি সব সময় তথ্য নিয়ন্ত্রণে নয়, কখনো তথ্যের ক্রমে সাজানো হয়। একই ঘটনা সামনে থাকে। শুধু দেখার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়।

লেখক : কণ্ঠশিল্পী ও কলাম লেখক

aananasrin@gmail.com