শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার কারণে কোনো কোনো চিকিৎসকের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ জন্ম নেয়। এই অহংবোধ সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে প্রায়ই বিরত রাখে। এই অথরেটেরিয়ান মনোবৃত্তির কারণে, মানুষ তাদের কাছ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো জানা থেকে অধিকাংশ সময় বঞ্চিত থাকে। এর ফলে সত্য প্রকাশ না পাওয়ার কারণে চরম মূল্য দিতে হয় মানবসভ্যতাকে। কয়েক দশক ধরে আমাদের কোনো কোনো চিকিৎসক বলছেন কোলেস্টেরল স্ট্রোক ও হৃদরোগের মূল কারণ এবং এসব রোগ থেকে বাঁচতে হলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে হবে। লাইফস্টাইল পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক উপায়ে নয়, কোলেস্টেরল কমাতে হলে চিরজীবন নামিদামি ওষুধ খেতে হবে। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন কোলেস্টেরল কোনো রোগ নয়, কোলেস্টেরল স্ট্রোক ও হৃদরোগের মূল কারণ নয়, বরং কোলেস্টেরল শরীরের জন্য উপকারী। শরীরে কোলেস্টেরল কমে গেলে, বিভিন্ন জটিল সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ বিশ^বিখ্যাত অবসরপ্রাপ্ত কার্ডিওভাসকুলার সার্জেন্ট ড. ডি. লান্ডেল এম. ডি. শেষ পর্যন্ত তার দীর্ঘদিনের ভুলের কথা অকপটে স্বীকার করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে গেছেন, শিরা-উপশিরার প্রদাহই ছিল হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মূল কারণ। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিরা-উপশিরায় ক্ষতিকর কোলেস্টেরল, আঁশ ও প্লাটিলেট জমে গিয়ে সৃষ্টি করে ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, ফলে হার্ট অ্যাটাক। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা যুগ যুগ ধরে বলেছেন, রক্তে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে কোলেস্টেরলের কারণে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসকরা অনন্তকাল থেকে রোগীদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো এবং চর্বিজাতীয় খাবার না খেতে পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। শরীরে কোলেস্টেরল বৃদ্ধির মূল কারণ চর্বিজাতীয় খাবার নয়, বরং অত্যাধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া। শরীরের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কোলেস্টেরল গ্লুকোজ থেকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে লিভারে তৈরি হয়। বাকি কোলেস্টেরল আসে কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবার থেকে। মাত্র কয়েক বছর আগে আবিষ্কৃত হলো হৃৎপি-ের শিরা-উপশিরার দেয়ালে ট্রান্স ফ্যাট, ফ্রি রেডিক্যাল ও প্রদাহই হৃদরোগের মূল কারণ। মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেয়ালে অনুরূপ প্রদাহ সৃষ্টি স্ট্রোকের কারণ। সনাতনী ধারায় চিকিৎসকরা যেভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে আসছেন, তাতে করে মানুষের মধ্যে মহামারী আকারে ওজন বাড়তে থাকল আর সৃষ্টি হলো মরণঘাতী রোগ ডায়াবেটিস। এই দুটো স্বাস্থ্য সমস্যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ভয়াবহতাকে আরও জটিল করে তুলল। চিকিৎসকরা মানুষকে পরামর্শ দিল, চর্বি খাওয়া বন্ধ করে দিতে আর রক্তে কোলেস্টেরল কমানোর জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো আবিষ্কার করল স্ট্যাটিন গ্রুপের অসংখ্য জাদুর ওষুধ। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ মানুষ কম চর্বি খাওয়া আর অধিক পরিমাণে স্ট্যাটিন গ্রুপের ওষুধ খাওয়া শুরু করল। তবু বছরের পর বছর ধরে স্ট্রোক আর হৃদরোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুহার বেড়ে চলল। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমা সত্ত্বেও, অধিকহারে কেন মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে চিকিৎসকরা খুব বেশি মাথা ঘামালেন না। এর অর্থ দাঁড়ায়, স্ট্রোক বা হৃদরোগের জন্য সরাসরি কোলেস্টেরল বা সম্পৃক্ত চর্বি দায়ী নয়। হৃৎপি- বা মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেয়ালগুলো ট্রান্স ফ্যাট, ফ্রি রেডিক্যাল ও প্রদাহে আক্রান্ত হলে এবং এসবের কারণে আহত বা ক্ষত সৃষ্টি হলে, এসব স্থানে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল, প্লাটিলেট ও আঁশজাতীয় পদার্থ জমা হয়। এ থেকে শুরু মূল সমস্যা, যাকে সহজ ভাষায় বলা হয় স্ট্রোক ও হৃদরোগ।
শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। শরীর ভাইরাস, জীবাণু বা ভিন্ন বহিরাগত পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত হলে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় শরীরের প্রতিরক্ষার নিমিত্তে তৈরি হয় অ্যান্টিবডিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবজ। শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অনান্য বহিরাগত পদার্থের আক্রমণ প্রতিহত করা গেলে প্রদাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরে যায়। কিন্তু প্রদাহের আক্রমণ যদি ক্রমাগত চলতে থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শিরা-উপশিরার দেয়ালে কোলেস্টেরল, আঁশ ও প্লাটিলেট জমে গিয়ে শিরা-উপশিরার রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। রক্তের চাপ বাড়লে, শিরা-উপশিরাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে ও রোগী মারা যায় বা অসুস্থ হয়। এই প্রক্রিয়া হচ্ছে স্ট্রোক। শিরা-উপশিরা বন্ধ হয়ে গেলে হৃৎপিন্ডের কোনো অংশে অক্সিজেন ও এনজাইমের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে, কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা মারা যায়। এই অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’ বা সহজ ভাষায় ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে। স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক যৌগগুলো কী কী তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এসব কালপ্রিট রাসায়নিক যৌগগুলো অতি পরিচিত এবং অনেকের কাছে অতি প্রিয় বস্তু, যা না হলে তাদের জীবন অচল হয়ে যায়। প্রথমত, ধূমপান থেকে নির্গত নিকোটিন ও অন্যান্য উপকরণ যা হৃৎপি- ও মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার প্রদাহে মূল ভূমিকা পালন করে। দৈনন্দিন খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি স্বল্পতা ও শিরা-উপশিরার প্রদাহের অন্য এক প্রধান কারণ। এতকাল আমরা জেনে এসেছি, সম্পৃক্ত চর্বির স্বল্পতা ও অসম্পৃক্ত চর্বি বা তেলের আধিক্য স্বাস্থ্যসম্মত। কর্ন, সানফ্লাওয়ার ও সয়াবিন তেল এবং বহু প্রক্রিয়াজাত খাবারে রয়েছে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড। অত্যধিক মাত্রায় ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ মাত্রাতিরিক্ত ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে শরীরে সাইটোকাইন রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। এই যৌগগুলো শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরের কোষপুঞ্জিতে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য দরকার ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড কোষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড বের করে দিয়ে, দুটো অ্যাসিডের স্বাস্থ্যসম্মত ভারসাম্য তৈরি করে। ওমেগা-৩ এর পরিবর্তে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের আধিক্যের কারণে, মাত্রাতিরিক্ত সাইটোকাইন তৈরির ফলে শিরা-উপশিরায় প্রদাহ সৃষ্টির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা অধিক হারে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে। সুস্থ শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপি-ের জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ মাছের তেল, তিসির তেল, হেরিং ও সার্দিনের তেল, কডলিভার তেল, সেমন ও ম্যাকারেল মাছ, বাদাম, বাটার নাট, ফলমূল, সবুজ শাকসবজি বেশি খাওয়া উচিত।
শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিন্ডকে সুস্থ রাখার জন্য পরিশোধিত চিনি, আটা, ময়দা এবং এসব শর্করা থেকে প্রস্তুত যাবতীয় প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেতে হবে। শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে, বিভিন্ন শর্করা বা চিনিসমৃদ্ধ খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিশোধিত চিনি বেশি খাওয়া হলে, অতি দ্রুত তা রক্ত প্রবাহে পৌঁছে যায়। ইনসুলিন এই চিনি বা অন্যান্য শর্করা থেকে উৎপন্ন গ্লুকোজকে কোষে পাঠিয়ে দেয় অথবা লিভারে গ্লাইকোজেন হিসেবে সঞ্চিত রাখে। মনে রাখা দরকার, সীমিত ইনসুলিনের গ্লুকোজ মেটাবলিজমের ক্ষমতাও সীমিত। অতিরিক্ত চিনি বা শর্করা গ্রহণ করলে অব্যবহৃত গ্লুকোজ, কোষ বা লিভারে জমা না হয়ে রক্তে ভেসে বেড়ায়। এমন কোটি কোটি গ্লুকোজ অণু শিরা-উপশিরার দেয়ালে প্রদাহ ও ক্ষত সৃষ্টি করে। এ কারণে ডায়াবেটিসের রোগীরা অত্যধিক হারে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। এর কারণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হতেই মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, স্ট্রোক ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মৃত্যুহার হ্রাসে সহায়তা করছে। রোগ হলে সুস্থতা বা জীবন রক্ষার জন্য প্রতিকার খুঁজতে হয়। তাই প্রতিকারের চেয়ে, রোগের কারণগুলো প্রতিরোধ করাই চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য। তবে স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তখন প্রতিকারের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প থাকে না। স্ট্রোক ও হৃদরোগ প্রতিকারে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন প্রতিকারে অ্যানজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারি বিশ্বজুড়ে সাফল্যজনক চিকিৎসা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা, পরিমিত পুষ্টিকর সুষম খাবার না খাওয়া, ধূমপান পরিহার না করা, ব্যায়াম না করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান না করা, লাইফস্টাইল পরিবর্তন না করা, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন না করা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস না রাখার কারণে আমরা স্ট্রোক ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হই। জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে সবাই সুস্থ থাকার ব্রত গ্রহণ করবেন এই প্রত্যাশা।
লেখক : জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশ্লেষক সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাবি অধ্যাপক, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি