বিদেশিরা বেশিরভাগ আসেন চাকরিসূত্রে, ব্যবসা ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে এবং পর্যটক ও শিক্ষার্থী হিসেবে। তাদের অনেকে বৈধ অবস্থানের মেয়াদ শেষে ফিরে যান। হাজার হাজার বিদেশি ভিসার মেয়াদ শেষেও বাংলাদেশ ছাড়ছেন না, এমন তথ্যও আছে। যারা অবৈধ হয়েও থেকে যান, তাদের অনেকে খোঁজেন কাজের সুযোগ। অন্যদিকে অনেকে নানা ধরনের গুরুতর অপরাধও করেন।
দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত ‘বহুমুখী অপরাধে বিদেশিরা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমন অপরাধ খুব কমই আছে, যা বিদেশিরা এখানে করছেন না। মানব পাচার, মাদক কারবার ও পাচার, জাল মুদ্রা তৈরি, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, বিয়ের নামে প্রতারণা, বৈদেশিক মুদ্রা পাচার, অনলাইন জুয়া, এমনকি খুন-ধর্ষণসহ নানা অপরাধ করছেন বহু বিদেশি। স্পর্শকাতর নথি ও তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাচার করছেন কেউ কেউ।
অবৈধ হয়েও যারা থাকেন বা অপরাধ করেন, তাদের অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষে পাসপোর্ট ফেলে দেন বা নষ্ট করে ফেলেন। এরপর পাসপোর্ট হারানোর কথা বলে থানায় জিডি করেন। কালেভদ্রে এরা কেউ মামলায় অভিযুক্ত হলে জিডি দেখিয়ে, বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে অবৈধ অবস্থান ও অপরাধ চালিয়ে যান।
ফৌজদারি অন্য বিধিবিধান প্রযোজ্য না হলে বিদেশিদের অবৈধ অবস্থানের বিষয়গুলো ‘দ্য রেজিস্ট্রেশন অব ফরেনার্স অ্যাক্ট’ (১৯৩৯), ‘দ্য ফরেনার্স অ্যাক্ট’ (১৯৪৬) ও ‘দ্য ফরেনার্স অর্ডার’ (১৯৫১) এবং ‘দ্য রেজিস্ট্রেশন অব ফরেনার্স (এক্সেম্পশন) অর্ডার (১৯৬৬) অনুযায়ী বিবেচিত হওয়ার কথা। বিধি-বিধানে ভিন্নরূপ বলা না থাকলে ছয় মাসের বেশি অবস্থানের ক্ষেত্রে বিদেশিদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করতে হয়। তা না করলে এবং ভিসার মেয়াদ শেষেও অবস্থানরত বিদেশির অবৈধ গণ্য হওয়ার ঝুঁকি আছে। অবৈধ অবস্থানের কারণে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল-জরিমানার বিধান আছে। মাঝে মাঝে সরকারি অভিযানে বিদেশি অপরাধী পাকড়াও হয়। কিন্তু বিদেশিদের অপরাধে জড়িত থাকার যে চিত্র প্রকাশ্যে আসে, সে তুলনায় অভিযানের ব্যাপকতা ও কার্যকারিতা বাস্তবে কতটা, সে বিষয়ে নাগরিকদের মধ্যেও প্রশ্ন আছে। ৬০ থেকে ৮০ বছরের পুরনো আইন-বিধিগুলো হালনাগাদ করা দরকার কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বর্তমানে কতজন বিদেশি বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে আছেন, কিংবা বিদেশি কতজন কর্মী কোন কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়াও দুষ্কর। সরকারি হিসাবে, প্রায় ৩৩ হাজার ৬৪৮ বিদেশি অবৈধভাবে এখানে আছেন। তবে বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ বিদেশির সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। বৈধ অনুমতি ছাড়াই কাজ করছেন, এমন বিদেশিদের মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন ও পাকিস্তানের নাগরিক বেশি।
অবৈধভাবে বিদেশিদের অবস্থান ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় অনেকের ভূমিকা আছে। অবৈধ অবস্থান জেনেও বিদেশিকে কাজে নেওয়া হচ্ছে। অনেক বাড়িওয়ালা বেশি ভাড়ার লোভে অবৈধ বিদেশির বাড়িতে অবস্থানের তথ্য গোপন করছেন।
আমরা মনে করি, বিদেশি যে কেউ দেশে প্রবেশ থেকে শুরু করে সব কর্মকা-ের তথ্য যাতে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের কাছে আসে, তেমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রয়োজনে কোনো কোনো বিদেশির ওপর নজর রাখাও প্রয়োজন হতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের কাজ দেয়, তারা এমন নিয়োগের বিষয়ে সরকারি অনুমোদন, পাসপোর্ট-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষকে দেবেন, এটা নিশ্চিত করা দরকার। যেসব বাড়িতে বিদেশিরা থাকেন, সেসব বাড়ির মালিক নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। প্রতিটি ক্ষেত্রে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২১ দেশের ৪০৭ নাগরিক অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সাজা শেষে মুক্তির অপেক্ষায় আছেন ১৭২ বিদেশি। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাস এবং বিদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশগুলোর সরকারের নজরে আনা যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে করণীয় ঠিক করা ও সমন্বয়ের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এই টাস্কফোর্স কী করল, তাও খতিয়ে দেখা যায়।
সব মিলিয়ে বিদেশিদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।