মানসিক স্বাস্থ্য চরম অবহেলিত জরিপ হয় না সাত বছর

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত। অনেকে যান না অবহেলা করে। আবার অনেকে পান না সেবা সহজলভ্য না হওয়ায়। দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল রাজধানী ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল সংকট। দেশে এই মুহূর্তে কত মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। গত সাত বছর জাতীয় পর্যায়ে কোনো জরিপও পরিচালিত হয়নি। সবশেষ জরিপ হয়েছে ২০১৯ সালে। সেই তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় তিন কোটির মতো মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

ওই জরিপের পর কয়েকটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ে দেশের মানুষ। ২০২০-২৩ সাল পর্যন্ত করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারী মোকাবিলা করতে হয়। তখন জীবন বাঁচাতে শুরু হয় সামাজিক দূরত্ব। প্রকট হতে থাকে রাজনৈতিক অস্থিরতাও। এক সরকারের দীর্ঘ শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে দেশের মানুষ। সোচ্চার হয় বৈষ্যমের বিরুদ্ধে। শুরু হয় কোটা আন্দোলন। যা রূপ নেয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। ২০২৪ সালে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা ধরে রাখা স্বৈরশাসক। সারা দেশে তাদের অনুসারীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে। অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের সংকটময় পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব সন্ত্রাস, সেই সময়ে আবার মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একটি জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই আবার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, হামের মতো আকস্মিক পরিস্থিতিতে শিশুমৃত্যু ও ২০১৯ সাল থেকে চলে আসা ডেঙ্গুর মতো জাতীয় সংকট পার করতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

এত কিছু মোকাবিলা করে দেশে কী পরিমাণ মানুষ এখন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে আগের তুলনায় মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যে বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এমন বাস্তবতায় আজ ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- “Lived 
Experiences Heard : Real Voices, Real Change|”। বাংলায় বলা হচ্ছে ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছরের প্রচারণায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে জীবনযাপন করা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও দক্ষতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উপলক্ষে মানসিক স্বাস্থ্যের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মেন্টাল হেলথ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করেছে জাতীয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের (বিএপি) সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিনের মতে, ‘মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শুধু মানসিক অসুখকে বুঝায় না। এর বিস্তৃতি আরও গভীরে। কারণ মনই আমাদের চালিকাশক্তি। কাজেই আমাদের প্রতিটি কর্মকান্ডের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য জড়িত।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন মনের খবরের সম্পাদক অধ্যাপক সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লবের মতে, দেশে মাদকের ভয়াবহতা, সেক্সুয়াল ডিসফাংশন প্রকট আকারে রয়েছে। এগুলোও মানসিক স্বাস্থ্যের অংশ। দেশে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা সহজেই বোঝা যাচ্ছে, এর মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি, মোবাইল আসক্তি, অনলাইন জুয়া, রিল দেখা, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সময় নষ্ট হওয়া এই বিষয়গুলো বাড়ছে। এ বিষয়গুলো কোন পর্যায়ে আছে তা জানার জন্য গবেষণা, জরিপ হওয়া জরুরি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পরিচালিত সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালে পরিচালিত জরিপ অনুসারে দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। এই হিসাবে ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। তাদের ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বিষন্নতা এবং ৪ দশমিক ৫ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে ভোগেন। অথচ এদের ৯২ শতাংশেরও বেশি বিজ্ঞানসম্মত কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাননি বা নেননি।

একই জরিপের ফল অনুযায়ী, ১৮ বছরের কমবয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগাক্রান্তের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ৫ জনে একজন এবং শিশুদের প্রতি ৮ জনের একজন কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় ভোগেন। শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসেনি।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, অন্তত ৫ বছর পর পর জাতীয় জরিপ হওয়া উচিত। ২০১৯ সালের পর থেকে আর কোনো জরিপ হয়নি। গত সাত বছরে দেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা বলা মুশকিল। তবে যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মানুষকে পার করতে হয়েছে, তাতে অবস্থা আগের থেকে খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। আগামী বছরে জরিপ হতে পারে। তখন বোঝা যাবে পরিস্থিতি কোন অবস্থায় আছে।

বিএপির সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং, দুর্নীতিসহ নানাবিধ অসংগতি মানসিক অবক্ষয়ের কারণেই হচ্ছে। বর্তমান সরকারের চাওয়া মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব আরও বাড়াতে হবে। স্বজনপ্রীতি, দলবাজি, তেলবাজি, ঘুষবাজি ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। আইনের শাসন কায়েম করতে হবে। সুষ্ঠু বিচারের সংস্কৃতি চালু করতে হবে। দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা ইত্যাদি মূল্যায়নের মাপকাঠি নির্ধারণ করে মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্ট সেই লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যথাসম্ভব আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

মানসিক রোগ চিকিৎসায় নানা প্রতিবন্ধকতা : সচেতনতার অভাব, ভ্রান্ত ধারণা, দক্ষ জনবলের অভাব, অবকাঠামোগত সমস্যা, বাজেটের অপ্রতুলতা ইত্যাদি। অসচেতনতা ও ভ্রান্ত ধারণার কারণে অসংখ্য রোগী অপচিকিৎসার শিকার হয়। এ কারণেই এবারের প্রতিপাদ্য শুধু ‘মানুষের কথা শুনতে হবে’ এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, শোনার পর আমরা কী পরিবর্তন করছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষকে শুধু তাদের গল্প বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো যথেষ্ট নয়; তাদের নীতি প্রণয়ন, সেবা পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশীদার করতে হবে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা সাধারণত বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলি। কিন্তু যিনি বিষন্নতা, উদ্বেগ, সাইকোসিস, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, আসক্তি বা অন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন, তার অভিজ্ঞতাও এই আলোচনার অপরিহার্য অংশ। তিনি জানেন একজন মানুষ প্রথম কখন বুঝতে পারেন যে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে, পরিবারকে বলতে গিয়ে কী ধরনের ভয় বা সংকোচ তৈরি হয়, চিকিৎসা নিতে গেলে কী বাধার মুখোমুখি হতে হয়, সমাজের আচরণ কেমন হতে পারে এবং সুস্থতার পথে কোন সহায়তাগুলো সত্যিই কার্যকর। এই অভিজ্ঞতার জ্ঞান বই বা প্রশিক্ষণ থেকে সবসময় পাওয়া সম্ভব নয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির নিজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ হলো তার কথা বিশ্বাস করা এবং তার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা। একজন ব্যক্তি হয়তো বলছেন, চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো তার জন্য কঠিন; অন্য কেউ বলছেন, পরিবারের নেতিবাচক মনোভাব তাকে চিকিৎসা নিতে বাধা দিয়েছে; আবার কেউ হয়তো চিকিৎসা পেলেও সামাজিক বৈষম্য বা কর্মক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার এমন কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে, যা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে সবসময় বোঝা যায় না।

আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে এখনো নানা ধরনের সামাজিক  কুসংস্কার রয়েছে। অনেকে মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। কেউ মনে করেন, ‘সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে’; কেউ আবার চিকিৎসা নেওয়াকে পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করেন। ফলে একজন মানুষ দীর্ঘদিন কষ্টের মধ্যে থেকেও সাহায্য চাইতে পারেন না।

কয়েকদিন আগে নানা হতাশা ও মানসিক বিপর্যস্ত থাকার কথা উল্লেখ করে একজন ফেসবুকে পোস্ট দেন। তখন তাকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন এই প্রতিবেদক। পোস্ট দেওয়া ওই ব্যক্তি চিকিৎসকের কাছে তো যানই-নি। বরং এই প্রতিবেদককে প্রশ্ন করে বসেন, ডাক্তার না হয়ে আপনি কেন হতাশার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন? তিনি যাবেন না, বলে জানিয়ে দেন।

আরেকজন তার ফেসবুকে লিখেছেন তিনি আর মানসিক পেইন নিতে পারছেন না। তিনি যদি খারাপ কিছু করে ফেলেন কেউ যেন তার সন্তানদের একটু দেখে রাখেন। পরে তিনি ঘণ্টা চারেক পরে আবার আরেক পোস্টে জানিয়েছেন তিনি ঠিক আছেন। একই সঙ্গে আগের পোস্ট ডিলিট করেন দেন। এর কয়েকদিন পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, তখনো তিনি পারিবারিক জটিলতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ঘুম আসে না। বুকের মধ্যে ছটফট করে। হতাশা বিষন্নতা কাজ করে। অস্থির লাগে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। চেঁচামেচি করেন। মাঝে মাঝে বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু এসব সমস্যায় তিনি কোনো মানসিক চিকিৎসক দেখাননি। দিন দিন তার হতাশা বাড়ছে। বাসার কেউও তাকে বুঝতে চায় না। কখন না জানি তিনি আত্মহত্যা করে বসেন সেই চিন্তায় আছেন।

মানসিক সমস্যা থেকে আত্মহত্যা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দশম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। প্রায় সোয়া ৭ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা উদ্বেগজনক। বছরে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। যারা করেন তাদের অধিকাংশেরই থাকে মানসিক সমস্যা। বেশির ভাগই ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা করেন। সচেতন থাকলে এসব আত্মহত্যার অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নেশা করা ব্যক্তিদের ৫০-৬০ শতাংশের মানসিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর বাইরে সম্পর্কে টানাপড়েন, বিচ্ছেদ, বেকারত্ব, আর্থিক সমস্যা, চাকরি হারানো, জীবনে কোনো খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে, বাবা-মা বা প্রিয় কারও মৃত্যু হলে কিংবা দূরে চলে গেলে, নিজে কিংবা প্রিয়জন দুর্ঘটনার শিকার হলে, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হলে এবং প্রত্যাশিত কিছু না পাওয়া ব্যক্তিদের মানসিক রোগে ভোগার আশঙ্কা বেশি থাকে। মানসিক সমস্যায় থাকা অধিকাংশই চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে উদাসীন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে কমিউনিটিভিত্তিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অধিকারভিত্তিক সেবার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতাল বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কমিউনিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।

চিকিৎসক সংকট : জানা গেছে, দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসক অনেক কম। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মরত জনশক্তি প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার জন্য মাত্র ০ দশমিক ৫০ জন। গত ৮ অক্টোবর বিএপি আয়োজিত সায়েন্টিফিক সেমিনারে বক্তারা বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক চিকিৎসা সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মানসিক রোগ বিভাগ সৃষ্টি ও সেখানে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পদায়ন। এর মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব মানসিক স্বাস্থ্যের ট্রিটমেন্ট গ্যাপ।

বিএপি সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, বর্তমান সরকার যথেষ্ট পরিমাণে বাজেট বৃদ্ধি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার চালুসহ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রধানমন্ত্রী : মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দৃশ্যত স্বাস্থ্যবান অথবা নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। সুতরাং, কোনোভাবেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।’

এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’ এ মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি মানুষের মর্যাদা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কাউকে তার মানসিক সমস্যার জন্য অবহেলা বা বিচ্ছিন্ন না করে তার কথা শুনতে হবে, পাশে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ সহজ করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবনযাপনকারীদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা প্রকৃত পরিবর্তনের পূর্বশর্ত।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানুষের মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনমানের উন্নয়নও সমান গুরুত্ব পাবে। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগলেও সামাজিক সংকোচ, সচেতনতার অভাব, সেবার সীমিত সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতির কারণে অনেকে যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে সরকার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, গুণগত মান ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’