প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার ভর্তুকি দেয় ৪ টাকা ৫২ পয়সা। বছর শেষে এই অঙ্ক এক জায়গায় করলে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিপরীত চিত্র দেখা যায় সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির বেলায়। কোম্পানিগুলো নিজেদের লাভজনক দেখিয়ে মুনাফার একটি অংশ ‘প্রফিট বোনাস’ হিসেবে কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছে। একজন কর্মী বেতনের বাইরে প্রতি বছর ‘প্রফিট বোনাস’ হিসেবে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। ভর্তুকির টাকায় চলা বিদ্যুৎ খাতের সরকারি কোম্পানির কথিত ‘প্রফিট বোনাস’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শ্রম আইনের একটি ধারার সুযোগ নিয়ে এই ‘প্রফিট বোনাস’-এর নামে প্রকৃতপক্ষে লুটপাট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোর ‘প্রফিট বোনাস’ নেওয়াকে অন্যায্য বলে মনে করে। গত ২৭ জানুয়ারি জারি করা একটি আদেশের মাধ্যমে এটি বন্ধ করে দেয়। ওই আদেশে (স্মারক নম্বর ২৭,০০,০০০০,০০০,০৮৯.৯৯,০০০১.২৩.৪৫) বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি ভর্তুকি সহায়তায় পরিচালিত বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন সরকারি মালিকানার এবং সরকার-টু-সরকার (জি টু জি) যৌথ অংশীদারত্ব ও অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে সরকারি ভর্তুকি সহায়তা চলাকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো লভ্যাংশ বণ্টন করা যাবে না। একই সঙ্গে ফ্যাসিলিটি অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের আগেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্যাসিলিটি অ্যাগ্রিমেন্ট বা ঋণ গ্রহণের শর্তে বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিতে বলা হয়েছে, ঋণের অর্থ পরিশোধ করার আগে কোনোভাবেই লভ্যাংশ বণ্টন করা যাবে না।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগের এক আদেশে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলো কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়ে প্রফিট বোনাস বণ্টন করে। বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করা একটি রিট পিটিশনের সূত্র ধরে ওই বছর ১৬ এপ্রিল একটি বৈঠক করে বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই বৈঠকে বলা হয় সরকার যে ভর্তুকি দেয় তা কোম্পানি দায় হিসেবে বিবেচনা করে না। এজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ কোম্পানিগুলোর হিসাব করার ক্ষেত্রে তিনটি পথ বাতলে দেয়। সেখানে সরকার প্রতি মাসে বিদ্যুৎ খাতে যে ভর্তুকি দিচ্ছে তা অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু গোল বেঁধেছে শ্রম আইনের সংশোধনীতে। শ্রম আইনে সাধারণ শ্রমিকদের যে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে তার সুযোগ নিতে চাচ্ছে ভর্তুকিতে চলা সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোও।
জানা যায়, বাংলাদেশ শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে নির্ধারিত হারে মুনাফার অর্থ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে জমা দিতে হয়। মোট ৫ শতাংশের মধ্যে ৮০ শতাংশ যায় অংশগ্রহণ তহবিলে। বাকি ১০ শতাংশ করে যায় শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে। অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থের একটি অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণ এবং আরেক অংশ অবসর সুবিধার জন্য সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। ফলে কোম্পানি মুনাফা দেখালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শ্রম মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কোম্পানির এই প্রফিট বোনাস বণ্টন স্থগিত করে আবার তারাই শ্রম আইন সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। সেখানে প্রফিট বোনাস দেওয়ার বিধান রাখা হয়। বর্তমান সরকার অধ্যাদেশটি গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস করে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার প্রফিট বোনাস বণ্টন না করার আদেশ দিলেও শ্রম আইনের সংশোধনীর ফলে এখন প্রফিট বোনাস দেওয়ার সুযোগই বহাল থাকল।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, আইনটি পাস হওয়ার পর এখন এটি বাস্তবায়নে বিধি তৈরি করা হচ্ছে। যেহেতু আইনে প্রফিট বোনাস বণ্টনের কথা রয়েছে, তাই বিধিতে এটি বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জানা যায়, শ্রম আইনের এই ধারাটি ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ছিল না। পরে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ আইন সংশোধন করার সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এখন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বাল্ক (পাইকারি) বিদ্যুতের গড় মূল্য ৮ টাকা ৩৯ পয়সা প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) দরে বিক্রি করে। কিন্তু প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১২ টাকা ৯১ টাকা খরচ হয়। এতে করে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৪ টাকা ৫২ পয়সা ঘাটতি থাকে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এ ছাড়া সরকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে কোম্পানিগুলোকে আর্থিক সহায়তা করে। এই ঋণের কিস্তিও সরকার থেকেই দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, প্রফিট বোনাস চালু হয়েছে গ্যাস উত্তোলন ও বিতরণ কোম্পানির দেখাদেখি। একসময় সরকার গ্যাস বিক্রি করে মুনাফা করত। কিন্তু এখন মুনাফা করার সুযোগ নেই। কারণ সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে এলএনজি আমদানি করে জ¦ালানি খাতকে টিকিয়ে রেখেছে। এসব কোম্পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় সরকারি অর্থে। আবার সরকার ভর্তুকি দিলে কোম্পানি মুনাফা করে কোন হিসাবে—এমন প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুনাফা কৃত্রিমভাবে তৈরি করে বণ্টন করা হচ্ছে। প্রকৃত হিসাবে সরকারি কোম্পানির কোনো মুনাফা হওয়ারই কথা না।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, যে প্রতিষ্ঠান সরকারি ভর্তুকিতে চলে তার আবার মুনাফা কী। এটির কোনো ন্যায্যতা নেই। উচিতও না। কোম্পানি লোকসান করলে কর্মী ছাঁটাই করা হয়। খরচ কমানো হয়। কিন্তু সরকারি কোম্পানির বেলায় এর উল্টা। কাঠামোগতভাবে এটি এক ধরনের লুণ্ঠন। এটি গত সরকার শুরু করেছিল বর্তমান সরকার তা অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র বলছে, শ্রম মন্ত্রণালয় আইনটির বিধি তৈরির জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট সরকারি কোম্পানির প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়েছে। তবে সরকারি কোম্পানির প্রতিনিধি ডাকলেও ভারত এবং চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে হওয়া বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়নি। যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো মুনাফা ভাগাভাগির বাংলাদেশি আইন বাস্তবায়নের পক্ষে নয় বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বিষয়টি শ্রম আইন-সংশ্লিষ্ট, এজন্য আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তিনি বলেন, এর আগে আমরা আমাদের মতামত জানিয়েছি। এখন শ্রম মন্ত্রণালয় বিধির ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে ডাকলে সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগ অংশ নেবে।
দেশে সরকারি পাঁচটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি রয়েছে। কোম্পানিগুলো গঠনের সময় সরকারি বেতন স্কেলের দেড়গুণ বেতন ধরে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। একসময় কোম্পানিগুলো বিদেশি কর্মীদের দিয়ে পরিচালনা করা হতো। পরে দেশীয় কর্মীদের আকৃষ্ট করার জন্য উচ্চ বেতন নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবার নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর কোম্পানিগুলোর বেতনও সমন্বয় করা হয়।
জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশের আগেই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি পাঁচ কোম্পানি প্রায় ৯৬ কোটি টাকা মুনাফা বিতরণ করে। এর মধ্যে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। আগের অর্থবছরে (২০২২-২৩) প্রতিষ্ঠানটি দিয়েছিল ১৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি (এপিএসসিএল) বিতরণ করেছে ২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তাদের বিতরণের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) কর্মীরা নিয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। রুরাল পাওয়ার কোম্পানির (আরপিসিএল) কর্মীরা নিয়েছে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে আরপিসিএলের এই অর্থের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আর বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেড (বিআরপিএল) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়েছে ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আগের বছর দিয়েছিল ২ কোটি ৯ লাখ টাকা।
দেশীয় কোম্পানির পাশাপাশি চীন এবং ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তিনটি বৃহৎ বিদ্যুৎ কোম্পানি রয়েছে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রগুলো ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবগুলো কোম্পানি যদি প্রফিট বোনাস বিতরণ শুরু করে তাহলে প্রতি বছর ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
শ্রম আইনের বিধি চূড়ান্ত হলে এবং ভর্তুকির বিদ্যুৎ খাতেও এটি কার্যকর হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আটকে রাখা টাকাও প্রফিট বোনাস হিসেবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রফিট বোনাসের দাবিতে আন্দোলন না করলেও যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ নিয়ে আন্দোলন করে আসছে। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ালেও ঋণ পরিশোধের আগে লভ্যাংশ বণ্টন করতে চায় না চীন এবং ভারতের সঙ্গে গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলো।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ একটি সার্কুলার দিয়েছে। আইন পাস হওয়ার পর বিধি করা হলেও ওই সার্কুলার বাতিল না করে প্রফিট বোনাস দেওয়া যাবে না।
কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, বিধি প্রণয়ন ও আইন কার্যকর হওয়ার পর সরকারি সার্কুলারের আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না। সর্বশেষ আইনই প্রাধান্য পাবে। সেক্ষেত্রে ভর্তুকির খাতকে যাতে লাভজনক দেখানো না যায়, তার ব্যবস্থা বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, আইন হলেতো আর বিদ্যুৎ বিভাগের সার্কুলার কার্যকর থাকে না। সত্যিকার অর্থে যদি মুনাফা হয় তাহলে শ্রমিকদের মুনাফার ভাগ পাওয়াটা দোষের কিছু না। কিন্তু যেখাত ভর্তুকিতে চলে সেই খাতে আবার মুনাফা কীভাবে হয়। সঙ্গত কারণে মুনাফার এই হিসাবে সরকারি ভর্তুকিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করাই হয় বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।