শারদীয় দুর্গোৎসবের আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠার অপেক্ষায় গোপালগঞ্জের পূজামণ্ডপগুলো। কোথাও চলছে প্রতিমায় রঙের শেষ প্রলেপ, কোথাও মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জার কাজ। উৎসবকে বর্ণিল ও আনন্দমুখর করে তুলতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পী, কারিগর ও পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা।
আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরই মধ্যে গোপালগঞ্জ শহর থেকে শুরু করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রতিমার সাজসজ্জা, মণ্ডপের নান্দনিকতা, আলোকসজ্জা এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে চলছে শেষ মুহূর্তের কর্মযজ্ঞ।
গোপালগঞ্জ শহরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে কেন্দ্রীয় কালী বাড়ি, গোহাটা কালী মন্দির, সিকদারপাড়া দুর্গামণ্ডপ ও সাহাপাড়া মণ্ডপে। পাশাপাশি জেলার ঐতিহ্যবাহী উলপুর জমিদারবাড়ি এবং টুঙ্গিপাড়ার মণ্ডলবাড়িতেও দুর্গোৎসব ঘিরে রয়েছে বিশেষ আয়োজন। প্রতিটি মণ্ডপেই নিজস্ব সাজসজ্জা ও আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবকে স্মরণীয় করে তোলার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। কোথাও প্রতিমার গায়ে রঙের শেষ প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চলছে অলংকার পরানো ও সাজসজ্জার কাজ। দেবী দুর্গার পাশাপাশি বিদ্যার দেবী সরস্বতী, ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী, দেবসেনাপতি কার্তিক ও সিদ্ধিদাতা গণেশের প্রতিমাও সাজানো হচ্ছে যত্নসহকারে। শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবী দুর্গার পরিবারের প্রতিমাগুলো।
প্রতিমা তৈরির এই ব্যস্ততার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারিগরদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও পরিশ্রম। মাটির কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে খড়, মাটি, রং ও অলংকারের কাজ-প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় দক্ষতা ও ধৈর্যের। উৎসবের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুত করতে এখন বিশ্রাম নেওয়ারও অবকাশ নেই শিল্পীদের।
প্রতিমাশিল্পী প্রহ্লাদ বিশ্বাস জানান, প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপেই যত্ন নিয়ে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে শেষ পর্যায়ে মাটির কাজ, মুখাবয়ব ও অলংকার তৈরিতে বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়, যাতে প্রতিমায় প্রত্যাশিত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। সময়মতো কাজ শেষ করাই এখন শিল্পীদের প্রধান লক্ষ্য।
প্রতিমাশিল্পী হৃদয় দাস বলেন, এবার তারা চারটি মন্দিরের দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি মন্দিরে প্রতিমায় রং করার কাজ শেষ করেছেন। বর্তমানে গোপালগঞ্জের সাহাপাড়া মন্দিরে প্রতিমায় রং করছেন তিনি। দুই দিনের মধ্যে এখানকার কাজ শেষ করে চতুর্থ মন্দিরের প্রতিমায় রং করতে সাতক্ষীরায় যাবেন। ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে তাদের দিনরাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
প্রতিমাশিল্পী সুজন পাল জানান, প্রতিমা তৈরির শুরু থেকেই নিরলস পরিশ্রম করতে হয়। শেষ মুহূর্তে রং ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীরা যখন শিল্পকর্মের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তখনই তাঁদের পরিশ্রম সার্থক হয়।
এ বছর গোপালগঞ্জ জেলায় ১ হাজার ৩০৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। বিপুলসংখ্যক মণ্ডপে উৎসবের আয়োজন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় কুমার সিকদার বলেন, দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যেরও প্রতীক। সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা তাদের।
এদিকে দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তৎপর রয়েছে গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ ও প্রশাসন। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানান, দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি ও টহল জোরদারের উদ্যোগও রয়েছে। এ বছরও প্রতিটি পূজামণ্ডপে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবেন।
দেবী দুর্গার আগমনে অশুভ শক্তির বিনাশ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণের প্রত্যাশা করেন ভক্তরা। সেই প্রত্যাশাকে সামনে রেখে গোপালগঞ্জে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পীদের তুলির আঁচড়, আয়োজকদের নিরলস শ্রম আর ভক্তদের অপেক্ষা-সব মিলিয়ে পূজার আগেই জেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। এখন শুধু ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষা।