ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা আন্দোলনে রবিবারও (১১ অক্টোবর) উত্তপ্ত থাকল রাজধানী দিল্লি। পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়া পেয়েই দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনের সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কার সাফ বার্তা, ‘লড়াই তো সবে শুরু হয়েছে। জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই প্রতিবাদ থামবে না।’ খবর আনন্দবাজার ও এনডিটিভি’র।
শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে জমায়েতের চেষ্টা করায় অন্তত ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছিল। রবিবারও তরুণ বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ফের যন্তর মন্তর অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টা করে। এদিন সকাল থেকেই পার্লামেন্ট স্ট্রিট, কনট প্লেস ও যন্তর মন্তর এলাকা কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়।
কনট প্লেসে ধরপাকড়, আটক আইসা নেত্রী ও সিপিএম সাংসদ
এ দিন দুপুর নাগাদ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ব্যারিকেড টপকে বিক্ষোভকারীরা কনট প্লেসের দিকে এগোতে শুরু করলে পুলিশ ধরপাকড় শুরু করে। নেতৃত্বে ছিলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-র ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। পুলিশ তাকে আটক করে। তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকেও আটক করা হয়। এর কিছুক্ষণ আগেই একই এলাকা থেকে প্রতিবাদে সামিল হওয়া সিপিআই(এম)-এর রাজ্যসভার সাংসদ জন বিট্টাসকেও আটক করে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, রবিবার একসঙ্গে চার-পাঁচ জনকে জমায়েত হতে দেখলেই আটকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিজেপি এদিন যন্তর মন্তরে ফের অভিযানের ডাক দিতেই বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধাসেনা মোতায়েন করা হয়। তবে শনিবারের মতো ট্রাফিক পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। কস্তুরবা গান্ধী মার্গ, মিন্টো রোড, বন্দে মাতরম মার্গে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হলেও অশোক রোড, টলস্টয় রোড ও জনপথের মতো পার্লামেন্ট স্ট্রিট সংযোগকারী রাস্তাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
নয়াদিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার সচিন শর্মা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে এবং শান্তি বজায় রাখতে দিল্লি পুলিশ বদ্ধপরিকর।
বিমানের ভেতর থেকে আটক, মুক্তির শর্ত নিয়ে বিতর্ক
এদিকে গ্রেপ্তার ও মুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বড় অভিযোগ তুলেছে সিজেপি। শনিবার সকালে মুম্বাই থেকে আসা ফ্লাইট দিল্লিতে নামার পর বিমানের ভেতর থেকেই সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে, সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা ও নেতা সৌরভ দাসকে আটক করা হয়। রাঙ্কার অভিযোগ, তাদের ‘অপহরণ’ করা হয়েছে। তাদের প্রতিরোধমূলক গ্রেপ্তারের আওতায় আটক করে রোববার সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট এক বছরের জন্য শান্তি ভঙ্গ না করার শর্তে তাদের মুক্তি দেন।
মুক্তির পরপরই দীপকে মহারাষ্ট্রে নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে যান দাদির শেষকৃত্যে যোগ দিতে। যাওয়ার আগে তিনি এক্স-এ লেখেন, ‘এমন কোনো বন্ডে সই করিনি যেখানে বলা হয়েছে— আমরা আর প্রতিবাদ করব না। আমরা আবার রাস্তায় নামব।’
সিজেপি-র পক্ষ থেকেও এক্স-এ স্পষ্ট করা হয়, ‘কোনো সিজেপি নেতাই এমন কোনো বন্ডে সই করেননি যেখানে বলা হয়েছে তারা আর প্রতিবাদ করবেন না। বন্ডে শান্তি ভঙ্গ থেকে বিরত থাকার কথা বলা আছে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং এটি শান্তি ভঙ্গ করে না।’
রাঙ্কার পাল্টা অভিযোগ, ‘শান্তি ভঙ্গ করেছেন নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জ্ঞানেশ কুমার।’ সৌরভ দাস বলেন, ‘প্রতিবাদ শুধু দিল্লিতেই হবে না, সারা দেশে হবে।’
তিনি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) অপব্যবহারের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপিকে নিশানা করেন। দীপকে যাওয়ার আগে বলেন, ১০ অক্টোবর দিনটিকে একনায়কতন্ত্র শেষের শুরু হিসেবে ধরা হবে।
পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, যন্তর মন্তর ২.০-র ডাক
সিজেপি-র আইনি দলের প্রধান রত্না সিং পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তার অভিযোগ, পুলিশ কর্মীরা আন্দোলনকারীদের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে এবং সন্তানদের প্রতিবাদে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলছে। গোয়েন্দা সংস্থা আইবি তার গতিবিধি অনুসরণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমি একজন নাগরিক। আমার যে কোনো জায়গায় যাওয়ার অধিকার আছে। কীভাবে আমাকে বেআইনিভাবে আটকে রাখতে পারেন?’
সৌরভ দাস অভিযোগ করেন, দিল্লি পুলিশের কর্মীরা জুতা পরে এবং মাথা না ঢেকে গুরুদ্বারা বাংলা সাহিবে প্রবেশ করেছে এবং জোর করে প্রতিবাদকারীদের সরিয়ে দিয়েছে। তিনি শিখ সম্প্রদায়কে পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানান। স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই) নেত্রী ঐশী ঘোষ বলেন, ‘যন্তর মন্তর ২.০ চলছে। আমরা রাস্তায় আছি, রাস্তাতেই থাকব। আমরা সংবিধান মেনে চলব।’
৭২ ঘণ্টা জরুরি অবস্থার মতো, বলছে সিজেপি
গত ৭২ ঘণ্টার পরিস্থিতিকে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছে সিজেপি। রাঙ্কা বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী ট্রেন বাতিল করেছেন, যেখানে ১৯৭৫ সালেও ট্রেন বন্ধ করা হয়নি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও অভিযোগ করেছেন, দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। শনিবারের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে দিল্লি মেট্রো ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রেখেছিল এবং রেলওয়ে প্রায় ২৫০টি ট্রেন বাতিল করেছিল। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীও শনিবার রাতে মুক্তি পাওয়াদের মধ্যে ছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, বিজেপির পাল্টা জবাব
ককরোচ জনতা পার্টি ও ছাত্র সংগঠনগুলোর বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার কঠোর নিরাপত্তা, ইন্টারনেট ব্যাহত এবং মেট্রো-রেল বন্ধের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। রবিবার বিশেষ শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ কেন্দ্রকে নোটিস দেয়। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দেয়, মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে হবে, ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করতে হবে এবং ইন্টারনেট পরিষেবা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আদালত আরও বলে, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র জমায়েতের ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত পদ্ধতি মেনেই পদক্ষেপ করতে হবে। যেখানে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা কার্যকর নয়, সেখানে আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, অবৈধ আটক বা নেমট্যাগ ছাড়া পুলিশের রাস্তায় থাকার অভিযোগেরও জবাব দিতে হবে। মঙ্গলবার পরবর্তী শুনানি।
অন্যদিকে বিজেপি সিজেপিকে বিরোধী দলের শাখা বলে অভিহিত করেছে। বিজেপি প্রধান নিতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, তারা বিদেশি শক্তির নির্দেশে ভারতের ক্ষতি করছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা সিজেপিকে রাহুল গান্ধী ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বি-টিম বলেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমতের অধিকার আছে, কিন্তু নৈরাজ্য ছড়ানো কারও অধিকার নয়।