পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ায় (কেপি) জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানয়েছে, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গতকাল রবিবার এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পরিচালিত ওই প্রাদেশিক সরকারের সব কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে গেল এবং প্রদেশটিতে গভর্নরের শাসন জারি হলো। আসিফ আলি জারদারির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রদেশটিতে সন্ত্রাসী হামলার ক্রমবর্ধমান ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের (পিএমও) এক বিবৃতিতে জানানো হয়, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারির কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রদেশটির আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সদস্যদের অবহিত করা হয়। বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ দমনে কেপি সরকারের ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রদেশটির অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে সদস্যরা প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। খাইবার পাখতুনখোয়ার সরকার সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে রয়েছে বলেও উদ্বেগ জানান তারা। কারাবন্দি নেতা ইমরানের মুক্তির দাবিতে তার দলের নেতা-কর্মীরা পাখতুনখাওয়া প্রদেশ থেকে গত ৪ অক্টোবর রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চ শুরু করেন। এখনো লংমার্চ কেপি প্রদেশেই অবস্থান করছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর কেপির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন প্রদেশটির গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি। সাবেক ফেডারেলি অ্যাডমিনিস্টার্ড ট্রাইবাল এরিয়াস (ফাটা), ট্যাংক, ডেরা ইসমাইল খান, লাক্কি মারওয়াত ও বান্নুসহ আটটি জেলার জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। প্রস্তাবিত সচিবালয়ে একজন অতিরিক্ত মুখ্য সচিব এবং একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) থাকবেন। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ড. মুহাম্মদ ফখর আলম ইরফানকে কেপির মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়োগ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত বহাল থাকবে। পাকিস্তান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (পিএএস) গ্রেড-২২ কর্মকর্তা ড. ইরফান এর আগে ফেডারেল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ছিলেন।
পিটিআই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, জরুরি অবস্থা জারি কিংবা গভর্নরের শাসন পাখতুনখাওয়ায় কোনো সমস্যার সমাধান আনবে না। দলটি কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করেছে। ডন জানিয়েছে, প্রদেশটির পিটিআই সভাপতি জুনায়েদ আকবর খান ও মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
রাওয়ালপিন্ডিতে ১৪৪ ধারা জারি : পিটিআইয়ের লংমার্চের কারণে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় ৩০ দিনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গত শনিবার রাওয়ালপিন্ডির ডেপুটি কমিশনার নাদিম নাসির সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে এ ঘোষণা দেন। আগামী ৮ নভেম্বর পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো স্থানে পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ।
স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জেলা গোয়েন্দা কমিটির (ডিআইসি) এক বৈঠকে ডেপুটি কমিশনারকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর ‘আসন্ন হুমকি’ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। এসব হুমকি মানুষের জীবন, সরকারি-বেসরকারি সম্পদ এবং জেলার সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে জানানো হয়। পাকিস্তানের আরও কয়েকটি এলাকায় ইতিমধ্যে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে দুই মাসের জন্য এ ধারা কার্যকর করা হয়। একইভাবে লাহোরেও ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১৪৪ ধারা কার্যকর রয়েছে। সেখানে জনশান্তি, স্থিতিশীলতা এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকির কথা উল্লেখ করে এ ধারা কার্যকর করা হয়।