জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ ও অবকাঠামো চিহ্নিত করা, কোথায় অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে, তা নির্ধারণ এবং সীমিত অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারে সরকারকে সহায়তা এ লক্ষ্য সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বাংলাদেশের ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন কো-পাইলট’ উদ্ভাবনী উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এই উদ্ভাবন জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থা ইউএনএফসিসিসি আয়োজিত ২০২৬ সালের এআই ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-এ চূড়ান্ত প্রতিযোগীর তালিকায় স্থান পেয়েছে। চূড়ান্ত তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, তানজানিয়া ও মালির চারটি উদ্ভাবন স্থান পেয়েছে।
আজ বুধবার কম্বোডিয়ার নমপেনে চারটি দেশের পাঁচটি উদ্ভাবনের মধ্যে একটিকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হবে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থা ইউএনএফসিসিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এআই ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম-২০২৬ এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। ২০২৫ সালে এই পুরস্কারের জন্য ১১০ দেশের ৬০০টি উদ্ভাবনী উদ্যোগ জমা হয়। বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী ফারিয়া ইসলাম সারা ও হাবিবুর রহমান হাবিবের ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন কো-পাইলট’ উদ্ভাবনী উদ্যোগটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, তানজানিয়া ও মালির মোট পাঁচটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়। এসব উদ্ভাবন কম্বোডিয়ার নমপেনে অনুষ্ঠেয় এআই ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম ২০২৬-এ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানেই আজ একটি উদ্ভাবনকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হবে। বিজয়ী উদ্ভাবনকে তুরস্কের কপ-৩১ সম্মেলনে প্রদর্শন করা হবে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, উপকূলীয় প্লাবন, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশটি একদিকে যেমন নানা অভিযোজন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রযুক্তির কার্যকরী ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সরকারি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জলবায়ুবিষয়ক কার্যক্রমকে দ্রুততর করতে পারে। আমরা ইতিমধ্যে বিশ^ব্যাপী এমন এক রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে অগ্রগতির গতি দুই ধরনের। ব্যবধান আরও বাড়ানোর পরিবর্তে এআইকে তা দূর করতে সহায়তা করতে হবে।’
বাংলাদেশের ক্লাইমেট অ্যাকশন কো-পাইলট হলো এমন একটি প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ, যেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভৌগোলিক তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, এলাকা ও অবকাঠামো শনাক্তকরণে কাজ করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কোথায় জলবায়ুর ক্ষতির আশঙ্কা বেশি, কোথায় আগে অর্থ বিনিয়োগ করা দরকার এবং কোন অভিযোজন উদ্যোগে তুলনামূলক বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।
ক্লাইমেট অ্যাকশন কো-পাইলট কীভাবে কাজ করবে : প্রথমত, স্যাটেলাইট ছবি, ভৌগোলিক মানচিত্র, বৃষ্টিপাত, বন্যার ইতিহাস, নদীর অবস্থান, জনসংখ্যা এবং সড়ক, স্কুল ও হাসপাতালের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা।
দ্বিতীয়ত, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা বা অন্যান্য জলবায়ুজনিত বিপদের ঝুঁকি বেশি, তা শনাক্ত করতে সহায়তা করা। তবে নির্দিষ্ট বিপদের পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা প্রকল্পটির প্রকৃত মডেলের ওপর নির্ভর করবে। এআই দিয়ে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হবে।
তৃতীয়ত, উপকূলীয় কোন এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বেশি এবং সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ সড়কের ঘাটতি রয়েছে কিনা এমন তথ্য একত্র করে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকা চিহ্নিত করা।
চতুর্থত, বাঁধ মেরামত, উঁচু সড়ক নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন কিংবা পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নের মতো বিকল্পের মধ্যে কোনটি বেশি জরুরি ও ব্যয় সাশ্রয়ী হতে পারে, তা তুলনা করার জন্য তথ্য দেওয়া। এক কথায় কোন কাজে আগে বিনিয়োগ করা দরকার, তা নির্ধারণে সহায়তা করা।
পঞ্চমত, বিশ্লেষণের ফল-মানচিত্র, ঝুঁকির তালিকা বা প্রতিবেদন হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সীমিত অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করবে, তা নির্ধারণে সহায়তা করা।
বাংলাদেশের জন্য এটির গুরুত্ব : বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর, নদীতীরবর্তী জনপদ ও নগরাঞ্চলে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির ধরন এক নয়। জলবায়ু ঝুঁকি ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী ভিন্ন। কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, কোথাও বন্যা ও নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা বড় সমস্যা। আবার নদীর তীরবর্তী এলাকায় নদীভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে তৈরি করা কোনো সাধারণ পরিকল্পনা সব এলাকার জন্য সমান কার্যকরী নাও হতে পারে। একটি কার্যকরী এআইভিত্তিক ব্যবস্থা ওইসব এলাকার ঝুঁকি ও অবকাঠামোগত চাহিদা তুলনা করে সহায়ক হতে পারে। তবে এআইয়ের বিশ্লেষণই চূড়ান্ত নয়। মাঠপর্যায়ের যাচাই, স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যয়ের হিসাব এবং বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নও প্রয়োজন।
জলবায়ু অর্থায়নে দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নীতিগত বিষয়। অভিযোজনের প্রয়োজন নির্ধারণ, প্রকল্প তৈরি, অর্থ বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন। ক্লাইমেট অ্যাকশন কো-পাইলটের মতো উদ্যোগ কার্যকরীভাবে বিকশিত হলে এ প্রক্রিয়ায় তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়তে পারে। প্রযুক্তির সুপারিশকে সরকারি পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করলেই এর সম্ভাব্য সুফল পাওয়া সম্ভব।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এআই ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যাওয়ার্ড- ২০২৬ পুরস্কারটির উদ্দেশ্য হলো স্বল্পোন্নত দেশ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক উদ্ভাবনী এআই প্রযুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এগুলোর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা। ইউএনএফসিসিসির টেকনোলজি এক্সিকিউটিভ কমিটি ও ক্লাইমেট টেকনোলজি সেন্টার অ্যান্ড নেটওয়ার্ক এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি এ উদ্যোগে অংশীদার হিসেবে রয়েছে।
প্রতিযোগিতায় ইন্দোনেশিয়ার, তানজানিয়া, মালির উদ্ভাবনগুলোও রয়েছে।