বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসব এ কথা অস্বীকার করা যায় না। প্রতি বছর দেশে প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বছর বছর স্থাপনার সংখ্যা বাড়ে বলে শোনা যায়। এ বছরও সংখ্যা অধিকতর হতে পারে। পূজা আয়োজনের সংখ্যাধিক্যে কি কোনো শুভ বার্তার সংকেত থাকে! কে জানে।
ধর্ম মতে, দেবী দুর্গা বছরে তিনবার পূজিতা হন। বসন্তকালে ‘বাসন্তী’, কার্তিকে ‘কাত্যায়নী’ এবং শরতে ‘দুর্গা’। শরতের দুর্গাপূজাকে বলা হয় ‘অকাল বোধন’ এবং এর পৌরাণিক ব্যাখ্যাও আছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মাত্রই গল্পচ্ছলে শোনা সেই পৌরাণিক কাহিনি সম্পর্কে অল্প-বিস্তর জ্ঞাত এবং তাকে শাস্ত্রীয় দর্শন হিসেবে বিশ্বাস করেন। এখানে পৌরাণিক এবং ধর্মতত্ত্ব মোটেও সাংঘর্ষিক নয়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বিপুল সম্পৃক্ততায়, ধর্ম বিশ্বাসের প্রগাঢ় উন্মাদনা আর সম্মিলিত আনন্দ উদ্দামতায় অকাল বোধনের শারদীয় দুর্গাপূজাই হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবন চর্চায় সবচেয়ে আপন হিসেবে গ্রহণীয়। ব্যাপারটা এমন যে, দুর্গা তো ঘরেরই মেয়ে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় সন্তান-সন্ততি নিয়ে স্বামীর কৈলাশের বাড়ি থেকে নিজে বাড়িতে নাইয়রে আসছেন যেন। বেড়ানো শেষ হলে আবার না হয় স্বামীর ঘরে ফিরে যাবেন। মাঝে মর্ত্যে কটা দিন সবাই মিলে আনন্দফুর্তি হবে। ফিরে যাওয়ার দিন বিসর্জনের ঘাটে সজল চোখে সমস্বরে অনুরোধ করবেন সামনের বছর যেন তিনি আবার আসেন। দেবী দুর্গা ফিরে যান বটে, রেখে যান আশা ও আশাভঙ্গের কত স্মৃতি! বাংলাদেশের বিশেষ কিছু অঞ্চলে ‘কাত্যায়নী’ পূজা বেশ ঘটা করে পালিত হয়। মাগুরা জেলা এবং সংলগ্ন অঞ্চল এক্ষেত্রে বিশেষভাবে। উল্লেখ্য, কাত্যায়নী পূজার চাকচিক্যময় উৎসবায়োজনে চার-পাঁচটি দিন মাগুরা অঞ্চল বেশ আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে। খুশি আনন্দ আর ভূরিভোজে বুঁদ হয়ে থাকা মাগুরাবাসী সব শঙ্কা ভুলে যেন খুঁজে পান সম্প্রীতির ঐতিহ্য। ভুলে যান প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বেদনা। বসন্তকালের ‘বাসন্তী’ সেই তুলনায় অনেকটাই নিষ্প্রভ, ম্যাড়ম্যাড়ে। বাংলাদেশের সার্বজনীন ‘বাসন্তী’ পূজা বোধহয় কমেও গেছে। কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখতে কোনো কোনো অঞ্চলে ‘বাসন্তী’ পূজার খবর এখনো পাওয়া যায়। কালের পূজা বলে কথা। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ক্ষীণ জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য এখন আর সুবিধাজনক স্থান খুঁজে পাওয়া যায় না।
আদিতে দুর্গাপূজা ধর্মের জটিল বিধান মেনে সম্পন্ন হলেও রাজশাহীর তাহেরপুর অঞ্চলের রাজা কংস নারায়ণ ষোড়শ শতাব্দীতে নয় লক্ষাধিক টাকা খরচ করে যে বারোয়ারি পূজার আয়োজন করেন সেটাই সম্ভবত বাংলাদেশে সার্বজনীন দুর্গা উৎসবের সূচনা। অঢেল খাদ্যসামগ্রী, গান-বাজনা, নানাবিধ খেলাধুলা, কবির লড়াই উপহার বিনিময়, বর্ণিল মেলার আয়োজন ইত্যাদি মিলিয়ে যে আনন্দ উৎসবের কথা জানা যায় তাকে সার্বজনীন উৎসব বলতেই হয়। নানা পেশা, নানা গোত্র, নানা সম্প্রদায় এবং ধনী-গরিবের মিলনমেলায় তাহেরপুরের পরম্পরাই বর্তমানকালে এদেশে সার্বজনীন দুর্গোৎসব। তাই বলে উৎসবটাই মুখ্য কেবল! পূজার ধর্মীয় আচারাদি কম গুরুত্বপূর্ণ, তা নিশ্চয়ই নয়। এখানে আরও একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তাহিরপুরের কংশ নারায়ণের পূজাকে টেক্কা দিতে রাজশাহীর ভাদুড়িয়ার রাজা জগৎনারায়ণ বেশি টাকা খরচ করে ওই বছরেই মহাআড়ম্বরে ‘বাসন্তী’ পূজার আয়োজন করেছিলেন। বর্তমানকালে পাড়ায় পাড়ায় ম-পে ম-পে প্রতিযোগিতার বিষয়টি সম্ভবত ওই সময় থেকেই শুরু হয়েছে।
দেবীপক্ষের শুরুতে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তিল-জল তর্পণ থেকে কোজাগরিতে ঘরে ঘরে লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান পর্যন্ত সবকিছুই শারদীয় দুর্গাপূজারীর অঙ্গ। দেবীপক্ষের সূচনা মহালয়ার পুণ্যময় আনুষ্ঠানিকতায়। তারপর মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী থেকে দশমীর বিসর্জন পর্যন্ত কত যে বিধান, কত যে নিয়ম, শুদ্ধ-অশুদ্ধের চর্চা ইত্যাদিকে পাশ কাটিয়ে কেবল উৎসবের ফুর্তি নিয়ে মেতে থাকলে দুর্গোৎসব পূর্ণতা পাবে না। শরতের অকাল বোধনে রাজেশ্বরী অর্থাৎ দেবী দুর্গা ছাড়াও পূজিত হন তার পুত্র-কন্যা। একই সঙ্গে পূজিত হয় হাঁস-ময়ূর-প্যাঁচা-ইঁদুর-সিংহ-কলাবউ-সাপ, এমনকি মহিষ ও মহিষাসুরও। ধর্মজ্ঞরা বলেন, দশভুজা দুর্গার ব্যবহৃত প্রতিটি অস্ত্রেরও নাকি আলাদা আলাদা পূজা হয়। তা ছাড়া সন্ধিপূজা, চ-ীপাঠ, প্রতিদিনের অঞ্জলি, নবপত্রিকা, ভোগান্ন-প্রসাদ, সন্ধ্যারতি, ব্রাহ্মসময়ের বিশেষ বিশেষ পূজা, সিঁদুর খেলা, কুমারী পূজা ইত্যাদি মিলিয়ে দুর্গাপূজার যে বিশালত্ব তার বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া অল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তবু দু-একটি প্রসঙ্গ না বললেই নয়। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, দেবীভাগবত পুরাণ, মার্কে-েয় পুরাণ, রাজা সুরথের প্রসঙ্গ, মধুকৈটভের কাহিনি, মহিষাসুরের কাহিনি, শুম্ভু-নিশুম্ভের কাহিনি ইত্যাদিতে পাওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। তবে সবখানেই প্রধান চরিত্র অসুরবিনাসী দুর্গতিনাশিনী মহামায়া দুর্গা। তিনি সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন মহাশক্তিধর ও অতিশয় ধূর্ত অসুরের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করেছেন বিশ্বব্রহ্মা-ের মঙ্গল এবং সব প্রাণিকুলের মঙ্গলের জন্য। দুর্গা নামের ব্যাখ্যা কেউ কেউ তাই এভাবে দেন যে, দানবীয় অপশক্তি, বাধাবিঘœ, দুঃখ-দুর্দশা, রোগবালাই ইত্যাদি সব প্রকার দুর্যোগ থেকে জন্মভূমি ও সব প্রাণিকুলকে যিনি রক্ষা করেন তিনিই রাজেশ্বরী দুর্গা। শত সহস্র বছর ধরে কী প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় শরতের অকালবোধনে এই রাজেশ্বরী দুর্গার পূজাই করে আসছে বাঙালি হিন্দুরা।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে শরৎকাল এক সময় খুবই মনোরম ছিল। বর্ষা যেতে না যেতেই ঝুপ করে নেমে আসত ভোরের কুয়াশা, শিশিরভেজা ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত মুক্তাদানার মতো শিউলি ফুল, নদী-খাল-জলাশয়ের পাশে সাদা কাশফুলের দোলা, থোকায় থোকায় ফুটে থাকা স্থলপদ্ম, সন্ধ্যায় হিম হিম ঠান্ডা। নগর জীবনে এসবের চিহ্ন বলতে গেলে আজ আর নেই। রসিকজনরা বলেন, বাংলাদেশে এখন নাকি মাত্র দুটি ঋতু গরমকাল এবং শীতকাল। আর তাই সুখে-দুখে, আনন্দ-বিষাদে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে, রোগ- শোক-মহামারীতে, আসুরিক শক্তির উল্লম্ফনে দেবী দুর্গার কাছে করজোড়ে ভক্তকুলের একটাই আন্তরিক প্রার্থনা, ‘জাগো, তুমি জাগো’। তবু রীতি-অনুসারে বর্ষা শেষ হতেই দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রস্তুতি শুরু করেন আসন্ন দুর্গাপূজার জন্য। চিরকালের অভ্যাসে ঘরদোর পরিষ্কার করেন। সন্তান-সন্ততিদের জন্য সাধ্যমতো নতুন পোশাক সংগ্রহ করেন এবং নাড়ু-মোয়া-মুড়কি ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করেন বাড়ির গৃহিণীরা। শরতের অকালবোধনে দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন উচাটন করা উৎসবের আবহ। পাশাপাশি কী এক অজানা শঙ্কাও! ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের সুন্দর দিনগুলোর মতো সম্প্রীতির আনন্দ উৎসবে মেতে উঠবে তো সবাই! ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গান গেয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করবেন না তো, সাধক শাহ আব্দুল করিমের অনুসারীরা।
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব