দশভুজা দুর্গা ও নারীশক্তি

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০০ এএম

হিন্দু পুরাণে নারীশক্তির ধারণা এক গভীর দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে। এখানে নারী কখনো সৃষ্টির আদি উৎস, কখনো জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী, কখনো জগতের পালনকর্তী। দুর্গা, কালী, সরস্বতী ও লক্ষ্মীর মতো দেবীমূর্তিতে নারী শক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে। তার মধ্যে দেবী দুর্গার আবির্ভাবের কাহিনি নারীশক্তির ধারণাকে এক বিশেষ তাৎপর্য প্রদান করে। পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবলোক যখন বিপর্যস্ত, তখন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতারা তাকে বিভিন্ন অস্ত্র প্রদান করেন এবং তিনি মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেবী মহিষাসুরকে বধ করে ন্যায় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে দেবী দুর্গা যেন নারীশক্তির প্রতীক হয়ে প্রকাশিত। কিন্তু যে সমাজে বাস্তব জীবনে নারী নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হয়েছেন, সেই সমাজের ধর্মীয় কল্পনায় দুর্গা আবার সর্বশক্তিময়ী, অশুভ বিনাশিনী এবং দেবতাদেরও রক্ষাকারী। এই বিষয়টি নারীশক্তির ইতিহাসকে আরও জটিল ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। দুর্গার দশভুজারূপে নারীর ক্ষমতা কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূমিকার মধ্যে আবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে যোদ্ধা, রক্ষাকর্ত্রী ও মাতৃসত্তা। প্রতীকীভাবে এই রূপ নারী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ যেন নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো দশ হাতের শক্তির ভার। সেই ভার একা সামলেও সমাজে নারী ঘরে-বাইরে সবখানেই বৈষম্যের শিকার হয়।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, নারী ও পুরুষের জৈবিক পার্থক্য  প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে কীভাবে সামাজিক ভূমিকা, ক্ষমতা ও অধিকারের বৈষম্যে পরিণত হয়েছে? কৃষির বিকাশ, সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার, শ্রম বিভাজন, যুদ্ধ, রাষ্ট্র ও ধর্মীয়-সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস কোনো সরল রেখায় এগোয়নি। কৃষিভিত্তিক সমাজের বিকাশের পর মেসোপটেমিয়া, প্রাচীন মিসর, সিন্ধু উপত্যকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে নগরসভ্যতা গড়ে ওঠে। এই সভ্যতাগুলোতে ধর্মীয় আচার, শাসনব্যবস্থা, সম্পত্তি ও পারিবারিক নিয়মের বিকাশ ঘটে। নারীর অবস্থানও অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল।

প্রাচীন সমাজে উর্বরতা, মাতৃত্ব, পৃথিবী এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত নারীদেবীর মূর্তি ও উপাসনার নিদর্শন পাওয়া গেছে। কিন্তু কোনো স্থানে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করতেন, এমন প্রমাণ মেলেনি। দেবীমূর্তির প্রকৃত পরিচয় ও সামাজিক তাৎপর্য অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কিত। এই বৈপরীত্য থেকে বোঝা যায়, ধর্মীয় কল্পনায় নারীর মহিমা এবং বাস্তব সমাজে নারীর ক্ষমতা দুটি সম্পর্কিত হলেও এক নয়।

দেবী দুর্গার নারীশক্তির ধারণাকে এই বৃহত্তর ইতিহাসের আলোকে দেখলে বোঝা যায় ধর্মীয় ঐতিহ্যে নারীর যে অসীম ক্ষমতার প্রতিচ্ছবি নির্মিত হয়েছে, বাস্তব সমাজে নারীর সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা হয়নি। হিন্দু পুরাণের কিছু কাহিনিতে নারীর শরীর, সতীত্ব, বিবাহ, মাতৃত্ব ও সামাজিক মর্যাদাকে পুরুষের কর্তৃত্বের অধীন হিসেবে দেখানোর প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। রামায়ণের সীতা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। রাবণের বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের পর তাকে সতীত্ব প্রমাণের জন্য অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। প্রচলিত উত্তরকা-ের আখ্যানেও প্রজাদের সন্দেহের কারণে গর্ভবতী সীতার বনবাসের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এসব ঘটনাকে নারীর চরিত্র ও যৌনবিশুদ্ধতাকে সামাজিক সম্মানের মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতার আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। এখানে পুরুষের মর্যাদা রক্ষার দায়ও যেন নারীর ওপরই ন্যস্ত হয়।

মহাভারতের দ্রৌপদীর ঘটনাতেও নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নটি তীব্রভাবে সামনে আসে। পাশাখেলায় যুধিষ্ঠির নিজের সম্পদ, ভাইদের এবং নিজেকে হারানোর পর দ্রৌপদীকে পণ রাখেন। এই ঘটনা একজন নারীকে স্বতন্ত্র অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে পুরুষের অধিকারাধীন সত্তা হিসেবে বিবেচনার প্রবণতাকে প্রকাশ করে। সভায় দ্রৌপদীর প্রশ্ন ও প্রতিবাদ তাই কেবল ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিক্রিয়া নয়; তা ন্যায়বিচার, আত্মমর্যাদা এবং নারীর স্বাধীন সত্তারও দাবি।

দেবী দুর্গার দশভুজা রূপের মধ্যে নারীর বহুমাত্রিক ভূমিকার প্রতিফলন দেখা যায়। একজন নারী একই সঙ্গে জ্ঞানচর্চা, পেশাগত জীবন, পরিবার, সামাজিক দায়িত্ব, সৃজনশীলতা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিতে পারেন। তবে এই বহুমুখী ভূমিকার অর্থ নারীর ওপর অসংখ্য দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং তার নিজস্ব সামর্থ্য, স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে চিন্তা করাই এখন সমাজের দায়।

লেখক : শিক্ষক, লেখক ও চিত্রশিল্পী

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত