সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা কেবল পৌরাণিক স্মৃতির পুনরাবৃত্তি নয়; শক্তির জাগরণ, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের প্রত্যয় এবং মানুষের মিলনক্ষেত্রও। দেবীর আগমনে শরৎ শুধু ঋতু বদলের গল্প বলে না, বলে জাগরণ, আনন্দ আর নতুন আশার কথাও। অশুভের বিনাশ ও শুভশক্তির বার্তা নিয়ে দুর্গোৎসব প্রতি বছর বাঙালির জীবনে ফিরিয়ে আনে নতুন আশা, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার উদযাপন
কী অদ্ভুতই না ব্যাপারটা বিল্ববৃক্ষের পাদদেশে বসে সেই বৃক্ষে দেবতার অধিষ্ঠান চিন্তা করে, ধূপ-ধুনা জ্বালিয়ে, মন্ত্র উচ্চারণ ও নৈবেদ্য নিবেদন করে দেবতাকে জাগ্রত করছেন ভক্ত-পূজারী! দুর্গাপূজার ষষ্ঠী-সন্ধ্যায় সেই ব্যাপারটি সম্পাদিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এরূপ অদ্ভুত ব্যাপার চর্চার মধ্য দিয়েই বাইরের অবলম্বনে (প্রতীক বা প্রতিমায়) দেবতার জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ অন্তরে দেবত্বের বিকাশ ঘটিয়ে আসছেন সনাতন ধর্মাবলম্বরীরা অতি প্রাচীনকাল থেকে। কিন্তু বিল্ববৃক্ষকেই বা কেন দুর্গা-বোধনের অবলম্বনরূপে নির্বাচন? এ রহস্য উদ্ঘাটনে সত্যানুসন্ধাকারীরা বেদ-পুরাণের তথ্যভান্ডার থেকে যে রসদ এনেছেন তার কিয়দংশ পরিবেশন করা যেতে পারে। তাতে জিজ্ঞাসুর তৃপ্তি যেমন মিটতে পারে আবার ভক্তিমানদের ভক্তি-বিশ্বাসেও নিষ্ঠা আসতে পারে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বিল্ববৃক্ষকে সূর্যের প্রতীক বলা হয়েছে ‘বিল্বং জ্যোতিরিতি আচক্ষতে।’ তাই সূর্যকে সর্বশক্তির আধার মনে করে তার কাছে মহাশক্তির আবাহন করা হয়। দুর্গাপূজা তো মহাশক্তিরই পূজা ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ’ শ্রীশ্রী চন্ডি ৫/৩২, ৩৩, ৩৪।
পুরাণ ও তন্ত্র সাহিত্যে বিল্ববৃক্ষকে শিবের প্রতীকরূপে কল্পনা করা হয়েছে। বিল্ববৃক্ষের ধ্যান মন্ত্রে বলা হয়েছে ‘ওঁ চতুর্ভুজং বিল্ববৃক্ষং রজতাভং বৃষস্থিতম্।/ ব্যাঘ্রচর্মাম্বরধরং শশিমৌলি-ত্রিলোচনম্।’ বিল্ববৃক্ষ আবার দেবী অম্বিকার (দুর্গার) খুব প্রিয় ‘শ্রীফলবৃক্ষ! ত্বমম্বিকায়াঃ সদা প্রিয়।’ শিবের অধিষ্ঠান হেতু বিল্ববৃক্ষ শিবসঙ্গিনী শিবারও (দুর্গা) অধিষ্ঠান হবে এটিই সংগত। তাই শিব ও দুর্গা উভয়েরই প্রতীকরূপে বিল্ববৃক্ষে পূজার বিধান। বৈদিক অশ্বমেধ যজ্ঞে যজ্ঞবেদীর সামনে রাখা হতো বিল্ব, খদির, উদুম্বর বা পলাশ গাছের একটি স্তম্ভ। সে স্তম্ভরই প্রতিভূ মনে করা হয় দুর্গাপূজায় বিল্ববৃক্ষকে। অনুষ্ঠানের কলেবর ও প্রক্রিয়া বিবেচনায় বিদ্বদ সমাজের মতো ‘দুর্গাপূজা’ বৈদিক অশ্বমেধ যজ্ঞেরই পরিবর্তিতরূপ। সূক্ষ্মবিষয়কে অনুধাবন করতে স্থূল অবলম্বন আবশ্যক হয়। ভগবতীরূপ অনন্ত সত্তাকে ভাবতে তাই বিল্ববৃক্ষরূপ স্থূল-আলম্বনে দেবীর বোধন ও পূজার আয়োজন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীভগবানও তার অনন্ত সত্তাকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অর্জুনকে সূর্য, চন্দ্র, অশ্বত্থবৃক্ষ, অগ্নি, সাগর ইত্যাদি ভগবানের কতিপয় বিভূতিকে ধ্যানের আলম্বনরূপে ভাবতে বলেছেন।
দেবতাকে জাগিয়ে দেবতার পূজো করা এ বিধান আবার কোত্থেকে এলো? পুঁথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে শাস্ত্রকাররা এ সম্পর্কে জানাছেন, রুদ্রযামল গ্রন্থে দুর্গাপূজাকে ‘দুর্গাযাগ’ বলা হয়েছে ‘স্বর্গাপবর্গ-সিদ্ধিশ্চ দুর্গাযাগাৎ প্রজায়তে।’ যাগের পূর্বদিন ‘পুরো নুবাক্যা’ পাঠ দ্বারা দেবতাকে উদ্দীপিত করে পরদিন যাগ আরম্ভ করতে হয়। দুর্গাযাগেও তেমনি ‘বোধন’ অনুষ্ঠানের দ্বারা দেবী দুর্গাকে উদ্বোধিত করে পরদিন থেকে প্রকৃত পূজানুষ্ঠান করতে হয়। ‘পুরো নুবাক্যের কাজ দেবতার প্রকাশন, উদ্বোধন ও উদ্বীপন ‘পুরো নুবাক্যয়া দেবতায়াঃ প্রকাশনাৎ’। তবে উৎসের চর্চায় বেশ দাপটের সঙ্গে জনমানসে স্থান দখল করে নিয়েছে ত্রেতাযুগের শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক দেবী-বোধন ও দেবী-পূজা। শ্রীরামচন্দ্র ও রামায়ণ-কথা কার না জানা! লোকের মুখে-মুখে ছিল এক সময় এ কাহিনি। রামঘরণী সীতাকে হরণ করে নিয়ে গেছে লঙ্কেশ্বর দুষ্ট রাবণ। জানকী বল্লভ শ্রীরামচন্দ্র প্রাণসম-স্ত্রী সীতাকে হারিয়ে বিমর্ষ, দিশেহারা ও ভীষণ বেদনায় ভারাক্রান্ত। সীতা উদ্ধারে রামবাহিনীর সঙ্গে রাবণ বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়েছে লঙ্কায়। এদিকে অকালে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। দেবতারা দেখলেন রামচন্দ্রের সমূহ বিপদের আশঙ্কা, মহামায়ার কৃপা ছাড়া রামচন্দ্রের জেতা সম্ভব নয়। রামচন্দ্রের সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেন তারা। তখন চলছিল সূর্যের দক্ষিণায়ন। দেবতারা সাধারণত নিদ্রিত থাকেন দক্ষিণায়ণে, জেগে থাকেন উত্তরায়ণে।
বৃহদ্ধর্ম পুরাণ জানাচ্ছেন, রামচন্দ্রের কল্যাণার্থে দেবী মহামায়ার (দুর্গা) স্তব শুরু করেছেন ব্রহ্মাদি দেবতারা। ‘হে দেবী, তুমি গিরিবাসিনী, বিল্বদলবাসিনী, তুমি দুর্গা, দুর্গতিহরা...। হে দেবী তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা... তুমিই ত্রিবিধপ্রসবিনী, তোমাকে নমস্কার।’ স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী কুমারীরূপে দেবতাদের দর্শন দিলেন এবং পরদিন বিল্ববৃক্ষমূলে দেবীর বোধন করতে বললেন। মর্ত্যে এসে দেবতারা বিল্ববৃক্ষের শাখায় পরমাসুন্দরী এক নারী মূর্তি দেখলেন এবং যথানির্দেশনা দেবীর বোধন ও শ্রীরামচন্দ্রের জন্য পূজা-প্রার্থনা করলেন। দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে বিনিদ্রতা নারী বালিকামূর্তি ছেড়ে চন্ডিকারূপে আবির্ভূত হলেন এবং বললেন, ‘সপ্তমী তিথিতে আমি রামচন্দ্রের দিব্য ধনুর্বাণে প্রবেশ করব, অষ্টমীতে রাম-রাবণের ভীষণ যুদ্ধ হবে, অষ্টমী নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমু- ছিন্ন ও পুনর্যোজিত হবে। নবমীতে রাবণ বধ হবে। দশমীতে রামচন্দ্র বিজয়োৎসব করবেন।’ দেবীর অনুগ্রহে শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধ করে সীতা উদ্ধার করেন। শ্রীরামচন্দ্রের শরৎকালীন এ দেবী-পূজার বিশদ বিবরণ আছে কালিকা পুরাণ ও কৃত্তিবাসী রামায়ণে। অকালে (দেবতাদের নিদ্রাকালে) অনুষ্ঠিত হলেও কালক্রমে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে শ্রীরামচন্দ্রের দেবীপূজা। প্রচলিত মত দেবীদুর্গার যে বোধন ও পূজা করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র তাই পরম্পরাক্রমে তন্ত্র-যন্ত্রে আবর্তিত-বিবর্তিত হয়ে বর্তমানে শারদীয় দুর্গাপূজার রূপ পরিগ্রহ করেছে।
স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিতে মানুষ ‘নররূপী নারায়ণ’। দেবতার জাগরণ মানে জীব বা মানুষরূপী দেবতার উন্নয়ন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, যখন আমরা অন্যের কথা ভাবি, অন্যকে ভালোবাসি, অন্যের উপকার ও উন্নতির চেষ্টা করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থপরতা, ঈর্ষা ও অহংকার বিসর্জন দিতে হয়। এভাবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একে অন্যের উন্নয়ন-চেষ্টা ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে স্বার্থপরতা ও ক্ষুদ্রতা বিনষ্ট হয়ে আমাদের অন্তরে বিশ্বপ্রেমের জাগরণ ঘটে। এটিই দেবত্বের জাগরণ বা বোধন। এই ‘দেবত্বের বোধন’ই স্বামী বিবেকানন্দের কাছে ‘ধর্ম’ বলে বিবেচিত। তিনি বলছেন, ‘বাহ্য ও অন্তঃপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে দেবত্বের বিকাশ সাধন করাই জীবনের লক্ষ্য। কর্ম, ভক্তি, যোগ ও জ্ঞান এদের যেকোনো একটি অবলম্বন করে অথবা একাধিক বা সবগুলোর সাহায্যে এই দেবত্ব বিকাশ করো ও মুক্ত হও। এটিই তো ধর্মের আদি-অন্ত।’
লেখক : সন্ন্যাসী, রামকৃষ্ণ মঠ, ঢাকা