স্বজনরা মিলে একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছিল বেশ আগে থেকেই। ব্যস্ততা আর নানা কারণে বারবারই পিছিয়ে যাচ্ছিল সেটি। অবশেষে দুর্গাপূজার লম্বা ছুটিকে বেছে নেন তারা। সিদ্ধান্ত হয় সবাই মিলে ঘুরে আসবেন কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত। সেই অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার পরিবারের ৯ সদস্য কক্সবাজারের উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। এসব মিলে একসঙ্গে সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করা, ঘোরাঘুরি আর আনন্দের মুহূর্তগুলো স্মৃতি করে রাখার প্রত্যাশা ছিল তাদের। এভাবে কেটেও যায় দুই দিন। গতকাল শনিবার তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার দিনেই রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে তাদের ছয়জনকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে।
অগ্নিকান্ডে একই পরিবারের নিহতরা হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), তার তিন বোন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), ফারিহা কবির (৩৩) ও ফারিহার সন্তান ফাইয়াজ আহম্মেদ (৭) এবং নাবিলার কাজিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ২০২০-২১ বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিস তেহামী ওরফে জাইফ (২৪)। এ ঘটনায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান ওই পরিবারের চার সদস্য। তারা হলেন মালিহার স্বামী আশিকুর ইসলাম, আশিকুরের মামাশ্বশুর মাসুদ ও তার স্ত্রী মিলা এবং ফারিহার স্বামী নুর আলম ইফতি। এর মধ্যে আশিকুর অগ্নিকান্ডের সময় রিসোর্টের দ্বিতীয়তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন, তার মামা ও মামি অগ্নিকান্ডের আগে সৈকত দেখতে যাওয়ায় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান। আর নুর আলম অফিসের কাজে গত শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন।
১০টা মিনিট সময় পেলে স্ত্রীও নামতে পারতেন : রিসোর্ট থেকে লাফিয়ে প্রাণ রক্ষা পাওয়া আশিকুরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আহাজারি করতে করতে তিনি বলছিলেন, ‘আর ১০টা মিনিট সময় পেলে আমার স্ত্রীও নামতে পারত। আগুন লাগার পর স্ত্রী ইসরাত তাকে ডেকে তুলেছিলেন। এরপর পাশের কক্ষে থাকা অন্য স্বজনদের ডাকতে যান ইসরাত। এর মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়লে তিনি দ্রুত একটি জানালা ভেঙে সেখান দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু স্ত্রী ইসরাত আর বেরিয়ে আসতে পারেননি। ১০ মিনিট সময় পেলে স্ত্রীও নামতে পারত। এসব বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আশিকুর।’ গতকাল শনিবারই তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। সেভাবেই তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার আগে সকালে আগুন সব তছনছ করে দেয়, জানান আশিকুর।
পরিবারের যে দুজন (মাসুদ ও তার স্ত্রী মিলা) সদস্য সৈকতে ছিলেন, তারা রিসোর্টে আগুন লাগার বিষয়টি দেখতে পেয়ে সেখানে ছুটে যান। কিন্তু আগুনের প্রবল তাপের কারণে আর রিসোর্টের ভেতর যেতে পারেননি। ফলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আর যোগাযোগ করতে পারেননি। পরে তারা ঢাকায় থাকা তাদের আত্মীয় আমিনুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে জানান। আমিনুল সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা থেকে বিমানে করে কক্সবাজার পৌঁছান।
আমিনুল ইসলাম সেখানে সাংবাদিকদের বলেন, আমার ভাগনে-ভাগনিসহ ছয়জন মারা গেছেন। আমার তিন বোনের পাঁচ ছেলেমেয়ে মারা গেছেন। এক ভাগনির ছোট বাচ্চাও মারা গেছে। দুদিন আগে তারা এসেছিল। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ওদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।
স্ত্রী-সন্তানসহ ৬ স্বজনকে হারিয়ে স্তব্ধ নুর আলম : স্ত্রী ফারিহা ও ছেলে ফাইয়াজ আহম্মেদকে আত্মীয়দের কাছে রেখে গত শুক্রবার কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গায় ফিরেছিলেন নুর আলম ইফতি। কথা ছিল শনিবার অন্যরা সবাই একসঙ্গে ফিরবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। শনিবার সকালে অগ্নিকা-ের খবর পেয়ে তিনি ঢাকায় ছুটে আসেন। নুর আলম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় আট বছর ধরে বসবাস করছেন। তিনি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের চুয়াডাঙ্গা মেডিকেল প্রমোশন অফিসার হিসেবে কর্মরত।
কাঁদতে কাঁদতে নুর আলম বলেন, শনিবার তাদের কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার কথা ছিল। কীভাবে রিসোর্টে আগুন লেগেছে জানি না। আগুনে আটকা পড়ে স্ত্রী, সন্তানসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। স্ত্রী ফারিহা অসুস্থ ছিল। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে অন্যের সহায়তা নিতে হতো তাকে। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিল, যাতে তার দেখাশোনা করতে সুবিধা হয়। কিন্তু সেই ভ্রমণই পরিবারের জন্য এমন মর্মান্তিক পরিণতি বয়ে আনবে, তা কল্পনাও করেননি তারা। নুর আলমের সাত বছরের সন্তান ফাইজান আহম্মেদ চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
ঢাবি ও জবির শোক প্রকাশ : অগ্নিকান্ডে ঢাবি ছাত্র নাফিস ও জবির ছাত্রী নাবিলার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে দুই বিশ্ববিদ্যালয়। গতকাল পৃথক শোকবার্তায় ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং জবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। পাশাপাশি অগ্নিকা-ের কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।