ভোলা দ্বীপে রয়েছে ছয় লাখেরও বেশি গরু-মহিষের বিশাল সমাহার। বিপুল পরিমাণ দুধ ও মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে এ অঞ্চল দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সরকার স্বপ্ন দেখছে এখানকার রোগমুক্ত মাংস বিদেশে রপ্তানি করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের। লক্ষ্য পূরণে রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রকল্প এবং স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাব)। কিন্তু এই বিশাল স্বপ্নের পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র জনবলসংকট। সাতটি উপজেলার পাঁচটিতেই কোনো উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নেই। কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের সবগুলো পদ শূন্য, আর কোটি টাকার আধুনিক ল্যাবটি পড়ে আছে জনবলহীন। ফলে একদিকে খামারিরা বঞ্চিত হচ্ছেন জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে, অন্যদিকে ভেস্তে যেতে বসেছে ভোলার রোগমুক্ত মাংস বিদেশে রপ্তানির মহাপরিকল্পনা।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলা কার্যালয়ের ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। সাত উপজেলার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে ৭৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৩৭ জন। অর্থাৎ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের এসব কার্যালয়ে অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এ সংকট চললেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হয়নি। জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের ৯টি পদের সবই শূন্য। ফলে গবাদিপশুর উন্নত জাত সম্প্রসারণ ও কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের পাঁচটি পদেও নেই কোনো জনবল। সেখানে নেত্রকোনা থেকে প্রেষণে একজন কর্মকর্তা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পাঁচজন শ্রমিক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের জনবল নিয়েও রয়েছে সংকট। হাসপাতালের অনুমোদিত পদসংখ্যা সম্পর্কে সরবরাহ করা তথ্যে ছয় ও সাতের ভিন্নতা রয়েছে। তবে চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. দীনেশ চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, হাসপাতালের সাতটি পদের মধ্যে তিনটি শূন্য। এ ছাড়া সদর ও লালমোহন উপজেলা ছাড়া বাকি পাঁচটিতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নেই। দুই উপজেলায় নেই ভেটেরিনারি সার্জন। উপজেলা সহকারী ও উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সাতটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। ড্রেসার ও অফিস সহায়কের সাতটি পদই শূন্য। এ সংকটের মধ্যেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রোগাক্রান্ত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ একটি পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে এখনো কোনো পদ সৃষ্টি বা জনবল পদায়ন করা হয়নি। ফলে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষাগারটি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বাণিজ্যিক ও পারিবারিক ৭০৫টি খামারে ৫ লাখ ৯৫ হাজার গরু পালন করা হয়। এ ছাড়া ১৮৮টি মহিষের বাথানে রয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ। ২৮২টি খামারে ২ লাখ ৬৯ হাজার ছাগল এবং ১৫১টি খামারে ২১ হাজার ৩০৬টি ভেড়া পালন করা হচ্ছে। গরু ও মহিষ থেকে বছরে ১ দশমিক ৭৩ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদনের তথ্য দিয়েছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর। তবে মাংস উৎপাদনের পরিমাণ সম্পর্কে সরবরাহ করা তথ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে।
পিপিআর রোগ নির্মূল ও ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় গত পাঁচ বছরে ভোলায় ৪২ লাখ ৬৩ হাজার গবাদিপশুকে ক্ষুরারোগের টিকা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে পিপিআর রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে প্রায় দুই লাখ প্রাণীকে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে ৯ মাস বাকি থাকতেই ৯০ শতাংশ সফলতা অর্জিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে পশুর মৃত্যুহার কমার পাশাপাশি উৎপাদন বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে টিকাদান কার্যক্রমে অগ্রগতি থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, পরামর্শ ও উন্নত প্রজননসেবা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন খামারিরা। জনবল সংকটের কারণে প্রত্যন্ত এলাকার খামারগুলোতে সময়মতো চিকিৎসক পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের খামারি মো. মাইনুদ্দিন গত ১৫ বছর গরু পালন করছেন। তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে তেমন সরকারি সেবা বা ওষুধ পাননি। গরু অসুস্থ হলে টাকা দিয়ে চিকিৎসক আনতে হয়। গত বছর কয়েকটি গরুর ক্ষুরারোগের টিকা পেয়েছিলেন। কিছুদিন আগে একটি গরু অসুস্থ হলে প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক ওষুধ লিখে দিলেও খামারে গিয়ে চিকিৎসা দিতে পারেননি। অসুস্থ গরু হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তার তিনটি গরু মারা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. দীনেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন, জনবল সংকটের কারণে রোগ নির্ণয়, টিকাদান, জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজননসহ নিয়মিত চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সীমিত জনবল নিয়েও তারা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হলে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খাঁন বলেন, গবাদিপশু পালনে ভোলা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। ভোলাকে পশুর রোগমুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা করা গেলে এখানকার মাংস বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। এতে খামারি ও কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রচলিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা কার্যালয়ে ১১টি করে পদ রয়েছে। বর্তমান চাহিদার তুলনায় এসব পদ আরও বাড়ানো দরকার। অথচ জেলার ৭ উপজেলায় অনুমোদিত পদের অর্ধেকের বেশি শূন্য। এ সংকটের কারণে রোগপ্রতিরোধ, চিকিৎসা, রোগ নিরাময়, সম্প্রসারণ ও কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিকল্প নেই।