কার্যকর বিশ্বমঞ্চের প্রত্যাশা  

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব সংস্থাটি আজ চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। শান্তি, সাম্য আর মানবতার প্রাচীর গড়ার যে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, বর্তমানে সেটি বিশ্বরাজনীতির জটিল আবর্তে ম্লান। শক্তির দম্ভ আর দুর্বল রাষ্ট্রের কান্নার মাঝে, বিশ্বমঞ্চের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয় জাতিসংঘ দিবস। দিনটির মূল তাৎপর্য হলো, বৈশি^ক শান্তিরক্ষা এবং যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা।

১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়া কর্র্তৃক দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণের মাধ্যমে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তখন জাতিসংঘ নিরপেক্ষতা রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। নিরাপত্তা পরিষদের ৮২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে তারা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের কোরিয়া উপদ্বীপে একপাক্ষিক সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেয়। এটি ছিল জাতিসংঘের সনদের ২(৪) ধারার চরম লঙ্ঘন। ১৯৫৬ সালের ২৯ অক্টোবর সুয়েজ খালের জাতীয়করণকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স যৌথভাবে মিসরের ওপর অন্যায় আগ্রাসন চালায়। নগ্ন হামলার মুখে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কেবল একটি যুদ্ধবিরতির বিবৃতি জারি করে দায়িত্বের সমাপ্তি টানে। ঘটনাটি জাতিসংঘের মূল সনদের ১(১) ধারাকে চরমভাবে উপহাস করেছিল। ১৯৬১ সালের ১৭ এপ্রিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রত্যক্ষ মদদে, কিউবার ‘বে অব পিগস’ এলাকায় সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ঘটনাটি জাতিসংঘের সনদের ২(৭) ধারার স্পষ্ট পরিপন্থী। ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশাল সৈন্য দল মোতায়েন করে, দীর্ঘ ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। বছরের পর বছর ধরে চলা, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর প্রস্তাব পাস করতে পারেনি। ঘটনাটি জাতিসংঘের সনদের ২(৪) ধারার মারাত্মক লঙ্ঘন। ১৯৬৮ সালের ২০ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ওয়ারশ জোটের সৈন্যরা চেকোস্লোভাকিয়ায় নগ্ন ও আকস্মিক সামরিক আগ্রাসন চালায়। এই ঘটনায় জাতিসংঘ বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এটি জাতিসংঘের সনদের ২(৪) ধারার সার্বভৌমত্ব রক্ষার নীতিকে ধূলিসাৎ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নৃশংস ও ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যা শুরু করে। দীর্ঘ নয় মাস চলা নির্মম নির্যাতন, জঘন্য অপরাধ ও অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কার্যকর হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে এটি কেবল গভীর উদ্বেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধ ছিল। এই নীরবতা জাতিসংঘের সনদের ১(৩) ধারার মানবাধিকার রক্ষা নীতির চরম লঙ্ঘন। বিশ্বব্যাপী এমন অসংখ্য ঘটনায়  জাতিসংঘ অকার্যকর প্রস্তাব ও বিবৃতির মধ্যে সংকটের আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত করেছে। এটি জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামে পানামায় আকস্মিক সামরিক আগ্রাসন চালায় এবং দেশের রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করে। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্বসংস্থাটি কেবল একটি সাধারণ নিন্দাসূচক প্রস্তাবের মাধ্যমে তার দায়িত্ব শেষ করে। এটি জাতিসংঘের সনদের ২(৪) ধারার চরম লঙ্ঘন। এ রকম অসংখ্য নজির রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। কিন্তু ইসরায়েল-ফিলিস্তন, ইসরায়েল-ইরান, ইরানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সমস্যায় জাতিসংঘ সমাধান দিতে পারছে না। বরং এটি কেবল পরাশক্তিদের আজ্ঞাবহ ও বিবৃতির সংস্থায় পরিণত হয়েছে। এর মূল কারণ প্রথমত, কাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ ক্ষমতার মধ্যে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের নিজস্ব স্বাধীন সামরিক বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নেই। কোনো ধরনের শান্তিরক্ষা বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের জন্য, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হয় জাতিসংঘকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিপুল অর্থায়নের কারণে, জাতিসংঘ তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।  তৃতীয়ত, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলোর আইনগত বাধ্যতামূলক কার্যকারিতা নেই। বিশে^র সিংহভাগ রাষ্ট্র কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে একমত হয়ে প্রস্তাব পাস করলেও, তা বাস্তবায়নের আইনি শক্তি সাধারণ পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা হয়নি। ফলে বিশ্বসংস্থাটি কেবল ‘বৈশ্বিক বিতর্ক সভা’ এবং ‘বিবৃতি মঞ্চে’ পরিণত হয়েছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা সনদের ১০ ও ১১ নম্বর ধারার কার্যকারিতাকে সীমিত করেছে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বল ও অনুন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেও, শক্তিশালী পরাশক্তিগুলোর ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন ও নমনীয়। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজের রায় বাস্তবায়নে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চরম উদাসীনতা ও ব্যর্থতা। আইসিজে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করলেও, নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ষষ্ঠত, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটগুলো সমাধানে জাতিসংঘের চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা। ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা সংকট, প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ দশকের পর দশক ধরে কেবল অর্থহীন সংলাপ ও বিবৃতির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। সর্বশেষ হলো, বিশ্বসংস্থার আধুনিক বিশে^র চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এর সনদের সংস্কারের চরম অনীহা।

আসলে, জাতিসংঘ তার মূল লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে বহু দূরে ছিটকে পড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে এর আমূল সংস্কার, ভেটো ব্যবস্থার বিলোপ এবং সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে না।

লেখক : কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক

eddanwar@gmail.com