খাদ্য উৎপাদনে স্বস্তি, নিরাপত্তায় শঙ্কা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ এএম

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন আশাব্যঞ্জক, তবে মানুষের কাছে খাবার পৌঁছানোর হিসাব ততটা স্বস্তিদায়ক নয়। বাজারে খাদ্যপণ্য থাকলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজনীয় খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকলে, পর্যাপ্ত উৎপাদন ক্ষুধা ও পুষ্টির সংকট দূর করতে পারে না। খাদ্য নিরাপত্তার প্রকৃত পরীক্ষা মাঠে কত ধান উৎপাদিত হলো, তাতে নয়; বরং মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কতটা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য নিশ্চিত করা গেল, এর ওপর। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে কৃষি উৎপাদনে অগ্রগতি, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য নিয়ে উদ্বেগ। ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষের আয়, জীবিকা, বাজারদর ও খাদ্যে প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এর প্রকৃত চিত্র বুঝতে খাদ্যের প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা একত্রে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে মানুষের আয় ও জীবিকার অনিশ্চয়তা বড় উদ্বেগের কারণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ আইপিসি ফেস থ্রি বা তার চেয়ে গুরুতর পর্যায়ের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে। এদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ আইপিসি ফেস ফোর বা জরুরি পর্যায়ে থাকতে পারে। মে থেকে আগস্ট সময়ে এ ধরনের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। উচ্চমূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া ও বন্যা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কমলেও পণ্যের দাম কমেছে, এমনটি নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কমেছে। ফলে দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় খাদ্য কেনার সামর্থ্য ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে, খাদ্য উৎপাদনের অগ্রগতি আশার সঞ্চার করেছে। এফএওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে ধান উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হতে পারে, যা গত চার বছরের গড় ৫ কোটি ৯৫ লাখ টনের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বোরো উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টন, আউশ ৪১ লাখ টন এবং আমনের প্রাথমিক পূর্বাভাস প্রায় ২ কোটি ৫৯ লাখ টন। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে ২০২৫ সালে প্রায় ১৯ লাখ টন চাল আমদানির বিপরীতে ২০২৬ সালে তা ৮ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ চালের অভ্যন্তরীণ দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম ছিল। তবে চালের উৎপাদন ও দামের ইতিবাচক চিত্র সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। এফএওর হিসাবে, ২০২৬ ও ২৭ অর্থবছরে দেশে মোট শস্য আমদানির প্রয়োজন প্রায় ৯১ লাখ টন হতে পারে, যার বড় অংশ গম। ফলে চালের ক্ষেত্রে স্বস্তি থাকলেও, অন্যান্য খাদ্যশস্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হলেও আয় ও ক্রয়ক্ষমতার অভাবে অনেক পরিবার তা কিনতে পারে না। তাই উৎপাদনের সাফল্যকে মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় রূপ দিতে কৃষকের ন্যায্য আয়, সাশ্রয়ী বাজারদর এবং খাদ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

জ্বালানি ব্যয় ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ খাদ্য নিরাপত্তার সংকটকে জটিল করে তুলছে। সেচ, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে জ্বালানি প্রয়োজন। এফএও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়কে খাদ্য নিরাপত্তার অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। হরমুজ প্রণালিসংক্রান্ত সরবরাহ বিঘ্ন ও বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব ভোক্তার বাজারদরে পড়ে। ফলে বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও, ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসে কৃষির ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে আউশসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে আউশের উৎপাদন প্রায় ৪১ লাখ টন হওয়ার পূর্বাভাস স্থানীয় কৃষকের ক্ষতি ও আয়হানির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। ফসল হারিয়ে কৃষক তাৎক্ষণিক আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী মৌসুমে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ কেনার সামর্থ্যও হারান। দুর্যোগের পর ত্রাণের পাশাপাশি দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উপকরণ সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আইপিসি বিশ্লেষণে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে খাদ্য নিরাপত্তার অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জও তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি এলাকার মধ্যে রয়েছে। কোথাও বন্যা ও নদীভাঙন, কোথাও পাহাড়ি ভূমিধস ও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও লবণাক্ততা, সীমিত কর্মসংস্থান ও নিম্ন আয় মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। শুধু জাতীয় উৎপাদন, খাদ্য মজুদ বা মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন যথেষ্ট নয়। স্থানীয় বাজারদর, মজুরি, কর্মসংস্থান, দুর্যোগের ক্ষতি ও পরিবারের খাদ্য কেনার সামর্থ্য সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য এবং ভোক্তার সাশ্রয়ী দামে খাদ্যপ্রাপ্তির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা সময়ের দাবি। উৎপাদন বাড়লেও কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগের সক্ষমতা হারাতে পারেন। আবার উৎপাদন ও সরবরাহের পর্যাপ্ততা থাকা সত্ত্বেও মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য, পরিবহন ব্যয় কিংবা বাজারের দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হতে পারে। তাই সরকারি খাদ্য মজুদ ও বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালের পাশাপাশি গমসহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আমদানির আগাম পরিকল্পনা করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সেচ, জ্বালানি, সার ও কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। মাটি পরীক্ষা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং ফসলভিত্তিক প্রযুক্তিগত পরামর্শের সম্প্রসারণ উৎপাদন ঝুঁকি কমাতে পারে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হবে উৎপাদন ধরে রাখা, কৃষকের আয় সুরক্ষিত করা এবং বাজারে খাদ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখা। সবচেয়ে জরুরি হলো, খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বাভাসকে আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। সম্ভাব্য ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে শুধু ত্রাণের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। আইপিসি ফেস থ্রি বা তার চেয়ে গুরুতর পর্যায়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য আগাম নগদ সহায়তা, খাদ্য সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রস্তুত রাখতে হবে।

দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের হাতে দ্রুত বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র, পশুসম্পদ ও কৃষিঋণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোন পরিবার খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছে, কোথায় দুর্যোগের পর জীবিকা ভেঙে পড়ছে এবং কোন এলাকায় জরুরি সহায়তা প্রয়োজন, তা শনাক্ত করতে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সংকটের আগেই সহায়তা পৌঁছাতে পারলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে এবং কৃষি উৎপাদন ও জীবিকার ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হবে। শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে খাদ্যচাহিদা সবার কাছে সবসময় সহজলভ্য করাই হোক রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এ জন্য কৃষকের ন্যায্য আয়, ভোক্তার সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তি, স্থিতিশীল কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তাকে কেবল কৃষি উৎপাদনের সাফল্য হিসেবে দেখলে মানুষের জীবনের বাস্তব সংকট আড়ালে থাকবে। বরং উৎপাদন, বাজার ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা ও আগাম প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। 

লেখক:  কৃষিবিদ ও প্রাবন্ধিক চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত