পায়ের সীমাবদ্ধতা হার মানাতে পারেনি সেলিমকে

অ্যাথলেটিকসে আপনার যাত্রা শুরু কীভাবে?

সেলিম রেজা : ২০১৪ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খেলাধুলা শুরু করি। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চিলমারি ইউনিয়নের ৪৮ নম্বর চিলমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম। হাইজাম্প দিয়েই আমার শুরু। এরপর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে টানা ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ২০১৫ সালে ময়মনসিংহে গ্রীষ্মকালীন স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হই। এরপর ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও স্বর্ণপদক জিতেছি। ২০১৯ সালে স্বাভাবিক অ্যাথলেটদের সঙ্গে জুনিয়র মিটে ব্রোঞ্জ পেয়েছিলাম। ২০২০ সালে একই প্রতিযোগিতায় ১.৮২ মিটার লাফিয়ে স্বর্ণ জিতি।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আপনার লড়াইটা কেমন ছিল?

সেলিম : আমার বাবা সিরাজ উদ্দিন শেখ, মা সালেহা আক্তার। আমরা চার ভাই, আমি সবার ছোট। সাত বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থ ছিলাম। হঠাৎ জ্বর হওয়ার পর থেকে ডান পায়ের ঊরুর পেশি অবশ হয়ে যায়। ডান পা নাড়াতে পারতাম না। আমার ডান পা বাঁ পায়ের চেয়ে প্রায় ছয় ইঞ্চি ছোট। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অনেকে বলতেন, পায়ে সমস্যা নিয়ে খেলাধুলা করে কী হবে! কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।

কঠিন সময়ে কে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন?

সেলিম : আমার কাছের শিক্ষক শরিফুল হক সূজা আমাকে সাহস দিতেন। তিনি বলতেন, ‘পা ম্যাটার করে না, ম্যাটার করে তোর প্রতিভা। প্রতিভাই তোকে ওপরে নিয়ে যাবে।’ কথাগুলো আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছে। নড়াইলের লোহাগড়া সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক দিলীপ স্যারের কাছেও দুই বছর অনুশীলন করেছি। নবম ও দশম শ্রেণিতে সেখানে পড়াশোনাও করেছি। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি।

জেলা পর্যায়ে খেলতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছিলেন?

সেলিম : কুষ্টিয়া জেলার হয়ে খেলার সময় অনেকে আমার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একবার জেলার ক্রীড়া অফিসে গিয়ে বলেছিলাম, আমি জুনিয়র মিটে খেলতে চাই। তারা বলেছিলেন, আমার পা ছোট, আমি কীভাবে খেলব; অন্য কাউকে দেখবেন। কথাটা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাইজাম্পে স্বর্ণ জেতার পর তাদের বলেছিলাম, দেখেন, আমি স্বর্ণ জিতে এনেছি। সেই অভিমান থেকেই পরে নড়াইলের হয়ে খেলেছি।

প্যারা অ্যাথলেটিকসে এলেন কীভাবে?

সেলিম : ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ভারতের প্যারা অ্যাথলেট মারিয়াপ্পান থাঙ্গাভেলুর পারফরম্যান্স দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তার ভিডিও দেখতাম। শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিনি স্বর্ণ জিতেছেন এটা আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। ২০২৩ সালে প্যারা অ্যাথলেটিকসে যুক্ত হই। তবে প্রতিযোগিতার আগে মাত্র ১৫ দিন অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই বছর হাংজু এশিয়ান প্যারা গেমসে ১.৭৫ মিটার লাফিয়ে সাতজনের মধ্যে চতুর্থ হয়েছিলাম। তখনই বুঝেছি, নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন করতে পারলে আরও ভালো করা সম্ভব।

আইচি-নাগোয়া এশিয়ান প্যারা গেমসে পদক হাতছাড়া হওয়ায় কতটা আক্ষেপ হচ্ছে?

সেলিম : আক্ষেপ তো আছেই। ১.৮৩ মিটার লাফিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স করেছি। কিন্তু উজবেকিস্তানের গিয়াজভ ১.৮৬ মিটার লাফিয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছেন। ব্যবধান মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য তিন সেন্টিমিটার। এত কাছে গিয়েও পদক না পাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। এবার পুরো শরীর অতিক্রম করলেও হাইজাম্পের ফাইবারে আমার পায়ের গোড়ালি লেগে গিয়েছিল। তবে এই ফল আমাকে থামিয়ে দেবে না।

ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

সেলিম : আমার বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন ও ভালো প্রস্তুতি পেলে আরও ভালো করতে পারব। আমার কোচ আল আমিন এবং ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি অব বাংলাদেশের (এনপিসি) কর্মকর্তাদের কাছে আর্জি জানিয়েছি দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের জন্য। এনপিসির সভাপতি নাসিরুল ইসলাম এবং মহাসচিব ড. মারুফ আহমেদ মৃদুল স্যারও আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন আগামীতে দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন করানোর জন্য। কারণ আমি চাই, বিশ্বের মানুষ আমাকে একজন খেলোয়াড় হিসেবে চিনুক। শুধু শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য নয়, আমার পারফরম্যান্সের জন্য পরিচিত হতে চাই। দেশের জন্য পদক জিততে চাই। আমার স্বপ্ন একদিন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে ধরা।