ইনানীতে অগ্নিকান্ডে ১০ মরদেহ উদ্ধার

জামিনযোগ্য ধারায় মামলা ওসিকে তলব

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় জামিনযোগ্য ধারায় মামলা করায় উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদারকে তলব করেছে আদালত। অসৎ উদ্দেশ্যে মামলাটি জামিন অযোগ্য ধারায় করা হয়নি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় গতকাল সোমবার বিকেলে উখিয়ার আমলি আদালতের বিচারক কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ এই আদেশ দেন। আগামী ২৯ অক্টোবর ওসিকে সশরীরে হাজির হয়ে কেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং বিভাগীয় শাস্তির নির্দেশ প্রদান করা হবে না এর ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়, গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১০ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই ঘটনায় ওইদিন রাতেই উখিয়া থানার এসআই আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর আইনে থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে রিসোর্টের এক মালিক ও তিন ব্যবস্থাপকসহ চারজনকে এজাহারনামীয় ও রিসোর্টের ১৯ কর্মচারীকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। ওই ঘটনায় মামলার ৪ নম্বর আসামি জাহিদ হোসেন সুমন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তিনি বর্তমানে কক্সবাজার কারাগারে রয়েছেন। তার রিমান্ডের শুনানি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে। মামলার এফআইআর ও অন্যান্য তথ্যমতে, টুপটুপ রিসোর্ট ফায়ার লাইসেন্স সংগ্রহ করেনি। এ ছাড়া ওই রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ফায়ার এক্সিট পয়েন্ট ছিল না। ফলে অগ্নিকান্ডে দগ্ধ পর্যটকরা রিসোর্ট থেকে বের হতে না পেরে ঘটনাস্থলেই ১০ জন মারা যান।

বিচারকের পর্যবেক্ষণ মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান টুপটুপ রিসোর্টের মালিক এবং সংশ্লিষ্টরা ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকলে দৈব দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে আগুনের সূত্রপাত হলে রিসোর্টের অতিথিরা বের হতে না পেরে মারা যাবে তা জানা সত্ত্বেও তারা রিসোর্ট পরিচালনা করেন। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে মামলার রেকর্ডিং অফিসার ওসি আতিকুর আসামিদের বিরুদ্ধে দি পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ৩০৪ জামিন অযোগ্য ধারায় (যার শাস্তি যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত) মামলা রেকর্ড করেনি। বরং অসৎ উদ্দেশ্যে আসামিদের আইনের উপযুক্ত শান্তি হতে রক্ষা করতে দি প্যানেল কোড, ১৮৬০-এর ৩০৪-ক/৩৩৮/৩৪ জামিনযোগ্য ধারায় (যার সর্বোচ্চ শান্তি ৫ বছর সশ্রম কারাদন্ড) মামলা রেকর্ড করেন। এর মাধ্যমে তিনি গুরুতর অপরাধ করেছেন।

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করেছেন, গেল ১৭ অক্টোবর ৩০৪-ক, ৩৩৮/৩৪ ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়। এর একদিন পর ১৯ অক্টোবর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৩০৪ ধারা সংযোজনের আবেদন করেন। অথচ এই মামলার রেকর্ডিং অফিসার ওসি আতিকুর রহমান মামলা দায়ের করার সময় ৩০৪ ধারা সংযোজন করেননি। এই বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার এসআই রোমন ঘোষ বলেন, এটি তদন্তাধীন মামলা। এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।

জেলা পুলিশের ফোকাল পারসন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, আদালত চাইলে যে কাউকে তলব করতে পারে। সেক্ষেত্রে রেকর্ডিং অফিসার লিখিত জবাব দেবেন। তবে পুলিশ এখনো উখিয়া থানার ওসিকে তলবের কোনো আদেশ পায়নি। কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মু. শাহাজাহান ইলাহি নূরী বলেন, উখিয়া থানার ওসিকে বুধবার আদালতে তলব করা হয়েছে। তাকে সশরীরে লিখিতভাবে কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

মেলেনি শিক্ষক মুক্তার সন্ধান : ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকা-ের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ১০ মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদের মধ্যে দুই স্বজনের পরিবারের ছয়জন এবং এক পরিবারের চারজন সদস্য রয়েছেন। তবে ঢাকার সাভারের আশুলিয়া গ্রামের মোস্তফা কামালের মেয়ে স্বপ্নবিলাস ইউনাইটেড স্কুলের শিক্ষক নাসরিন আকতার মুক্তার ডিএনএ মেলেনি।

শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলো হলো ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার নুর আলমের স্ত্রী চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ার বাসিন্দা ফারিয়া কবীর, তার ছেলে ফাইজান, ফারিহার ছোটভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী জেরিফ এবং রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিমের তিন মেয়ে ইসরাত জাহান মালিহা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভী; তারা তিনজন ফারিহার খালাতো বোন। যশোরের মণিরামপুরের মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী আফসানা আক্তার এবং তাদের দুই শিশু রোবাইনা আকতার ও সুনাইনা আকতার।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমন ঘোষ বলেন, সিআইডি নিহতদের মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষা করে এবং তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে তা মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেছে। কক্সবাজার পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ডিএনএ প্রতিবেদন পেয়েছি। নিহতদের স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।  গত ১৭ অক্টোবরের অগ্নিকা-ের ঘটনায় রিসোর্ট থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন ছিল।