যমুনার বুকে নৌভ্রমণ, খোলা আকাশে রঙিন ঘুড়ি ওড়ানো, বাউল গানের সুর আর কলাপাতায় পরিবেশিত সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিটুলি-প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির এক মিলনমেলা বসেছিল গত শুক্রবার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলে। সমবায় ও সামাজিক সংগঠন ‘সমধারা’র আয়োজনে দিনব্যাপী ‘চর উৎসব’ শুধু বিনোদনের উপলক্ষ হয়ে থাকেনি, বরং নদীর বুকের এই জনপদকে নতুনভাবে চেনার সুযোগ তৈরি করেছে। উৎসবের সাজসজ্জায় ছিল সিরাজগঞ্জের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য গামছা। শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ঘুড়ি ও খাবার।
আনন্দ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যমুনার চর কি শুধু নদীভাঙন, জীবিকার অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার সংগ্রামের নাম, নাকি এই জনপদ হয়ে উঠতে পারে কৃষি, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও লোকজ ঐতিহ্যের নতুন ঠিকানা।
যমুনার বুকে জেগে ওঠা চরগুলো শুধু বালু, মাটি আর পানির সমষ্টি নয়। বিস্তীর্ণ বালুচর, সবুজ ফসলের মাঠ, পাখির আনাগোনা আর নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা মিলিয়ে এ অঞ্চলের রয়েছে স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তবে এর আড়ালে রয়েছে নদীভাঙন, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সেবা পাওয়ার নানা সংকট। ভিটেমাটি হারিয়েও এখানকার মানুষ নতুন করে ঘর বাঁধে, ফসল ফলায়, জীবিকার পথ খোঁজে। তাদের এই সংগ্রামের পাশাপাশি রয়েছে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞান।
মেছড়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইউনিয়নটিতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম। পুরো ইউনিয়নে রয়েছে মাত্র তিনটি উচ্চবিদ্যালয়, ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মাদ্রাসা ও সাতটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নটির শিক্ষার হার প্রায় ২৫ শতাংশ। প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্থানীয় শতাধিক মানুষ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তাদের মধ্যে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য, স্কুলশিক্ষক থেকে শুরু করে সচিব পদে কর্মরত ব্যক্তিও রয়েছেন। তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থাকলেও অপর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। যানবাহনের অভাব ও দুর্গম পথ পেরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মেছড়া ইউনিয়নের মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষি। কৃষির পাশাপাশি গবাদিপশু পালন আরেকটি বড় আয়ের খাত। সারা বছরই এখানের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ধান, গম, বাদাম, ভুট্টা, সরিষা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চাষ হয়। স্থানীয়রা জানান, তবে এবার সারসংকটের কারণে কিছু কৃষক নির্দিষ্ট কয়েকটি ফসলের আবাদ থেকে বিরত থেকেছেন। উৎপাদন খরচ, কৃষি উপকরণ সংগ্রহের সংকটের পাশাপাশি ফসল বাজারজাত করতেও নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় তাদের। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতায় উৎপাদিত ফসল সহজে বড় বাজারে নেওয়া যায় না। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই কম দামে স্থানীয়ভাবে ফসল বিক্রি করেন। এতে পরিশ্রমের তুলনায় ন্যায্য দাম থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানো গেলে মেছড়া ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি চরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে কৃষিতে। চরাঞ্চলের মাটি, পানি ও পরিবেশ অনুযায়ী উপযোগী ফসল নির্বাচন, উন্নত বীজের ব্যবহার, আধুনিক চাষপদ্ধতি এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবা জোরদার করা প্রয়োজন। ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা, শাকসবজি ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের চাষ বাড়ানোর সুযোগ যাচাই করা যেতে পারে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, যাতে উৎপাদন বাড়ার সুফল কৃষকের আয়েও প্রতিফলিত হয়। এ ছাড়া কৃষির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটন। ফসলের মাঠ, কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় খাবার ও গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে ঘিরে ছোট পরিসরে পর্যটন কার্যক্রম গড়ে তোলা সম্ভব। নৌভ্রমণ, লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির আয়োজন তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। নারীরাও স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যভিত্তিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোনের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেনের দেশ রূপান্তরকে বলেন, যমুনার চরাঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে এটি কৃষি, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
অন্যদিকে স্থানীয়রা বলছেন, সিরাজগঞ্জের গামছা, বাউলগান, পিটুলির মতো ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এ অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ। সমধারার মতো সামাজিক সংগঠন এবং স্মার্ট ট্যুরিজমের মতো উদ্যোগ স্থানীয় মানুষ, কৃষক, উদ্যোক্তা ও সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে এই পরিচয়কে আরও বিকশিত করতে পারে।
যমুনার চরাঞ্চলকে ঘিরে স্বপ্ন শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা নয়। এ স্বপ্ন কৃষকের আয় বাড়ানোর, তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরির, নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার। নদীভাঙনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও চরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে যমুনার চর হয়ে উঠতে পারে জীবিকা, মর্যাদা ও সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা।
স্মার্ট ট্যুরিজমের স্বত্বাধিকারী মো. আসলাম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের পর্যটনের নতুন ঠিকানা হিসেবে চরাঞ্চলকে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে চর উৎসব একটি নতুন সংযোজন। সামনের দিনগুলোয় এ ধরনের আরও আয়োজনের মাধ্যমে আমরা ভিলেজ ট্যুরিজমকে এগিয়ে নিতে চাই।