রেকর্ড চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন লুলা

ইতিহাস গড়ে চতুর্থ মেয়াদে ব্রাজিলের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। দেশটির সরকারি নির্বাচন কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবারের দ্বিতীয় দফা ভোটের প্রায় ৯৯ শতাংশ গণনা শেষে দেখা গেছে, ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ এই বামপন্থি নেতা পেয়েছেন ৫১.৭৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে তার ৪৫ বছর বয়সী প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্র সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২৫ শতাংশ ভোট। ফ্লাভিও হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। নির্বাচনের প্রথম ধাপে এই সিনেটর প্রথম হয়ে বাবার কট্টর-ডানপন্থি আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করার আশা করেছিলেন।

গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া প্রথম ব্যক্তি লুলা দ্য সিলভা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সব জরিপ, অতীতের দৃষ্টান্ত ও বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে থাকা জনরোষকে ভুল প্রমাণ করে পাওয়া তার এই জয় লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থিদের উত্থানের জোয়ারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সাও পাওলোতে উৎফুল্ল সমর্থকদের সমাবেশে দেওয়া বিজয়ী ভাষণে লুলা বলেন, তিনি পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়েছে। এ নির্বাচনে নেতিবাচকতা ও মিথ্যার পরাজয় হয়েছে। লুলা তার ভাষণে বলেন, ‘দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি সবার সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। ব্রাজিলের জনগণের নির্বাচিত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করবেন বলেও জানান লুলা। তিনি বলেন, ‘তার সরকার হবে ব্রাজিলের সব মানুষের জন্য’। লুলা বলেন, ‘তার নির্বাচনী প্রচার মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছে যে গণতন্ত্র রক্ষায় ভোট দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।

নির্বাচনী প্রচারে লুলা দ্য সিলভা বারবার বলেছেন, ব্রাজিল কারও বাড়ির ‘পেছনের উঠান’ নয়। বিজয়ী ভাষণে সে কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। লুলা ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ অবস্থানের কারণেই তিনি ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন। ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বলে মনে করা কর্মকাণ্ড প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিজয়ে ভূমিকা রাখায় লুলা তার নির্বাচনী প্রচারের সমন্বয়কারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি ব্রাজিলের মানুষের উদারতারও প্রশংসা করেছেন। তিনি তরুণদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কারণ, তারা ব্রাজিলের গণতন্ত্র রক্ষায় রাস্তায় নেমেছিলেন। সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে লুলা বলেন ভোটাররা বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভোট দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই মানুষ ভোট দিয়েছেন। প্রথম ধাপে ভোট না দেওয়ার হার ছিল রেকর্ড ২১.০৮। তবে দ্বিতীয় ধাপে এই হার কমে ১৯ শতাংশে নেমে আসে।

এদিকে, নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ফ্লাভিও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ভোট দেওয়ার সময়সীমা দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে দিয়েছিল, এ যুক্তিতে তিনি ফল বাতিলের দাবি জানাবেন। তিনি বলেন, এ ফল মেনে নেওয়া অসম্ভব। ফল বাতিলের দাবি জানাতে গিয়ে ফ্লাভিও বলসোনারো বলেন, ‘খেলার নিয়ম বদলে দেওয়া হয়েছে।’ তবে ব্রাজিলের ইতিহাসে কখনো কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল বাতিল করা হয়নি।

বৈশ্বিক বামপন্থার অন্যতম প্রতীক এবং চলতি শতাব্দীতে ব্রাজিলের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন লুলা। গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন লুলা। রাজনীতিতে আসার পর ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালে টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০০২ সালে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে আসা প্রথম প্রেসিডেন্ট। সংবিধান অনুযায়ী, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর লুলা পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে বলসোনারোর বাবা এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে হারিয়ে তিনি আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করার অপরাধে জইর বলসোনারোকে কারাগারে পাঠানো হয়। লুলার এই জয় জইর বলসোনারোর জন্যও একটি দুঃসংবাদ।