শীতের শুরু আর শেষে আবহাওয়ার মেজাজ থাকে খামখেয়ালি। সকালে হালকা কুয়াশা, বিকেলে মৃদু হিমেল বাতাস, আবার দুপুরে রোদের উষ্ণতা। এ সময় ভারী শীতের পোশাক পরতে যেমন অস্বস্তি লাগে, তেমনি একেবারে গরম কাপড় ছাড়াও চলতে চায় না। পোশাকের এই দোটানায় সহজ সমাধান হতে পারে ছোট ও পাতলা চাদর। হালকা উষ্ণতা, স্বস্তি আর ফ্যাশন তিনের মেলবন্ধনে শীতের শুরুর দিনগুলো হয়ে উঠতে পারে অন্যরকম। লিখেছেন আনুষ্কা রীতা
পাতলা ছোট চাদরের বিশেষত্ব হলো, প্রয়োজন অনুযায়ী সহজেই গায়ে জড়িয়ে নেওয়া যায়, আবার গরম লাগলে ভাঁজ করে ব্যাগেও রাখা সুবিধা। আকারে ছোট হওয়ায় বহন করতে ঝামেলা নেই। একই চাদর কখনো কাঁধে, কখনো গলায়, আবার কখনো দুই পাশে ছড়িয়ে শালের মতো ব্যবহার করা যায়। পোশাকের ধরন ও ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী এর ব্যবহারেও আসে বৈচিত্র্য। কেবল শীত নিবারণের উপকরণ নয়, বরং সাজে নতুন মাত্রা যোগ করারও অনুষঙ্গ।
কাপড়েই স্বস্তির ছোঁয়া
পাতলা চাদরের আরাম অনেকটাই নির্ভর করে কাপড়ের ওপর। সুতি, খাদি, মসলিন, ভিসকস, জর্জেট, শিফন ও সিল্কের মতো কাপড় দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের শর্ট চাদর। প্রতিটি কাপড়ের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। সুতি ও খাদির চাদর দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য আরামদায়ক। এগুলো সহজে বহন এবং সাধারণ পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যায়। মসলিনের চাদর হালকা, নরম ও সুন্দরভাবে শরীরে জড়িয়ে থাকে। অন্যদিকে, সিল্ক ও ভিসকসের চাদরে থাকে মসৃণতা এবং হালকা উজ্জ্বলতা। জর্জেট ও শিফনের চাদর তুলনামূলক পাতলা। এগুলোতে প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি কিংবা লেসের কাজ সহজেই ফুটিয়ে তোলা যায়। ফলে সাধারণ পোশাকেও আসে উৎসবের আমেজ। আবার খাদি ও সুতি কাপড়ে ব্লকপ্রিন্ট, হাতের কাজ কিংবা দেশীয় মোটিফের চাদর বেশ আকর্ষণীয়। কাপড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, ব্যবহারের ধরন ও আরামকে গুরুত্ব দিতে হয়।
নকশায় যত বৈচিত্র্য
পাতলা চাদরের নকশায় এখন দেখা যায় নানা ধরনের বৈচিত্র্য। একরঙা চাদরের পাশাপাশি রয়েছে দুই বা তিন রঙের সমন্বয়, টাই-ডাই, শেডেড কালার, জ্যামিতিক নকশা, ফুলেল প্রিন্ট ও বিমূর্ত মোটিফ, হ্যান্ড পেইন্ট, হ্যান্ড স্টিচ, কারচুপির নকশা। দেশীয় নকশায় শাপলা, পদ্ম, লতা-পাতা, জামদানি মোটিফ কিংবা ঐতিহ্যবাহী নকশার ব্যবহার চাদরকে দেয় আলাদা পরিচিতি।
যারা সাধারণ সাজ পছন্দ করেন, তাদের জন্য একরঙা বা হালকা প্রিন্টের চাদর ভালো। অন্যদিকে, একটু ব্যতিক্রমী সাজের জন্য বেছে নেওয়া যায় কনট্রাস্ট রঙের চাদর। যেমন কালো পোশাকের সঙ্গে হলুদ, লাল কিংবা অফ হোয়াইট চাদর। আবার সাদা বা ক্রিম রঙের পোশাকের সঙ্গে নীল, সবুজ কিংবা মেরুন চাদরেও তৈরি হতে পারে আকর্ষণীয় রঙের সমন্বয়।
চাদরের পাড়েও এসেছে বৈচিত্র্য। সরু কিংবা চওড়া লেস, কাঁথা সেলাই, ক্রুশের কাজ ও সূচিকর্মের ব্যবহার চাদরকে আরও নান্দনিক করে তোলে।
পোশাকের সঙ্গে মিল
ছোট ও পাতলা চাদরের অন্যতম বিশেষত্ব হলো, এটি নানা ধরনের পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যায়। সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, ফতুয়া, টপ কিংবা শার্ট সবকিছুর সঙ্গেই ব্যবহার করা যায়। শাড়ির সঙ্গে পাতলা চাদর কাঁধে জড়িয়ে নিলে সাজে আসে আভিজাত্য। বিশেষ করে অফিসে যাওয়ার সময় কিংবা বিকেলের নিমন্ত্রণে পোশাকের সঙ্গে মানানসই সংযোজন।
জিনস ও টপের সঙ্গে লম্বাটে প্রিন্টের চাদর গলায় একবার পেঁচিয়ে পরলে তৈরি হয় ক্যাজুয়াল লুক। আবার কুর্তি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে দুই কাঁধে ছড়িয়ে পরা যায় হালকা চাদর। একরকম ওড়নার বিকল্প। একরঙা পোশাকের সঙ্গে বহুরঙা চাদর সাজে বৈচিত্র্য আনে। বিপরীতে, নকশা করা পোশাকের সঙ্গে একরঙা চাদর পরলে সাজে ভারসাম্য থাকে।
অফিসের পোশাকের সঙ্গে বেছে নেওয়া যায় ধূসর, নেভি ব্লু, বেইজ কিংবা প্যাস্টেল রঙের চাদর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় উজ্জ্বল রং ও প্রিন্টের চাদর ভালো মানায়। সন্ধ্যার দাওয়াতে সিল্কের ওপর হালকা সূচিকর্ম কিংবা লেসের কাজ করা চাদর পরা যেতে পারে। ভ্রমণের সময় এমন চাদর বেছে নেওয়া ভালো, যা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখা যায় এবং প্রয়োজনে দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নিতে পারবেন।
চাদরের বিশেষত্ব
হালকা শীতের ছোট চাদরের বড় সুবিধা হলো এর বহুমুখী ব্যবহার। সকালে কিংবা বিকেলে হালকা ঠান্ডা লাগলে চাদরটি গায়ে জড়িয়ে নেওয়া যায়। ঘরের ভেতরে বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও এটি কাজে আসে। ঠান্ডা কমে গেলে সহজেই ভাঁজ করে ব্যাগে রাখা যায়। আরেকটি সুবিধা হলো, একই চাদর বিভিন্ন পোশাকের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। ফলে প্রতিবার নতুন পোশাক কেনার প্রয়োজন হয় না। রং ও নকশা বুঝে চাদর কিনলে একটি অনুষঙ্গ দিয়েই একাধিক সাজ তৈরি করা সম্ভব। যারা পোশাকে স্তর তৈরি করে সাজতে পছন্দ করেন, তাদের জন্যও খুব কাজের হবে। তবে খুব পাতলা কাপড়ের চাদর তীব্র ঠান্ডায় পর্যাপ্ত উষ্ণতা দেবে না। তাই ব্যবহারের সময় আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
কোথায় মিলবে, দাম কেমন
দেশীয় ফ্যাশন হাউজের পাশাপাশি বিভিন্ন বিপণি বিতান ও অনলাইন দোকানে পাওয়া যায় ছোট ও পাতলা চাদর। আড়ং, রঙ বাংলাদেশ, বিশ্বরঙ, দেশাল, অঞ্জনস ও নিত্য উপহারের মতো ফ্যাশন হাউজে দেশীয় নকশার চাদর খুঁজে দেখতে পারেন। ঢাকার নিউ মার্কেট, মৌচাক মার্কেট ও গাউছিয়া মার্কেটেও রয়েছে নানা রং, কাপড় ও দামের চাদর।
দামের ক্ষেত্রে কাপড়, নকশা, কাজের ধরন ও ব্র্যান্ডভেদে পার্থক্য থাকে। সাধারণ মানের পাতলা চাদর বা শাল প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তুলনামূলক ভালো কাপড়, বিশেষ প্রিন্ট কিংবা হাতের কাজ করা চাদরের দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। অনলাইন দোকানেও বিভিন্ন দামের চাদর পাওয়া যায়; তবে কেনার আগে কাপড়ের বিবরণ, মাপ, রং এবং ফেরত দেওয়ার শর্ত দেখে নেওয়া ভালো। এগুলো আনুমানিক দাম দোকান ও সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
কেনার সময় শুধু নকশা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কাপড়ের কোমলতা, সেলাইয়ের মান ও ব্যবহারিক দিক বিবেচনা করতে হবে। দিনের আলোয় রং দেখলে প্রকৃত রং সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। চাদরটি কাঁধে জড়িয়ে কিংবা গলায় পেঁচিয়ে দেখলে এর দৈর্ঘ্য ও ব্যবহার কতটা স্বস্তিদায়ক, তা বুঝতে পারবেন। খুব বেশি আয়োজন ছাড়াই পোশাকে নতুনত্ব আনতে পারে ছোট্ট একটি চাদর। কখনো দেশীয় নকশায়, কখনো আধুনিক প্রিন্টে, আবার কখনো একরঙা সৌন্দর্য এই অনুষঙ্গেই বদলে যেতে পারে শীতের শুরুর দিনের চেনা সাজ।