বিশ্বকাপ ফাইনালের হারের পর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতশত কাল্পনিক গল্পই না ডালপালা মেলেছিল! কিন্তু মাঠের লড়াইটা আসলে কতটা গভীর ছিল, তা হয়তো ফুটবলারদেরই ভালো জানার কথা। সেটিই জানালেন আর্জেন্টিনার বর্তমান অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো। সবশেষ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে শিরোপা হারানোর পর ছড়িয়ে পড়া সমস্ত ষড়যন্ত্রের বিতর্ক উড়িয়ে দিয়েছেন আলবিসেলেস্তেদের এই বিশ্বজয়ী ডিফেন্ডার।
শুধু তাই নয়, দলের টানে কতটা শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে ইনজেকশন নিয়ে ফাইনালে নেমেছিলেন, সেই রোমহর্ষক সত্য প্রকাশ করে আর্জেন্টাইন শিবিরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন এই ফাইটার।
সম্প্রতি আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’-এর অনুষ্ঠান ‘লস এদুলস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফাইনালে হারের নেপথ্যে কোনো রহস্য বা অস্বাভাবিক কিছু ছিল কি না, এমন প্রশ্নে চরম বিরক্ত প্রকাশ করে রোমেরো সাফ জানিয়ে দেন যে, স্পেন মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়েই জিতেছে এবং তারা জয়ের যোগ্য ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিত্তিহীন গুঞ্জনকে পাত্তা না দিয়ে রোমেরো বলেন, ‘ফাইনালে কিছুই ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন জায়গা, যেখানে কেউ একটা বোকামিপূর্ণ কথা লিখলেও সেটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। স্পেন নিজেদের কাজ ঠিকঠাক করেছে। আমরা কোনোমতে টিকে গিয়েছিলাম। এটাকে অলৌকিক ঘটনা বলব কি না জানি না, তবে পুরো বিশ্বকাপটাই আমাদের জন্য শারীরিকভাবে কঠিন ছিল। আমাদের কয়েকজন খেলোয়াড় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতেই হিমশিম খেয়েছে, আমিও তাদের একজন।’
ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে দল নিয়ে নিজের গর্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করে রোমেরো আরও যোগ করেন, ‘কী বলা হচ্ছে, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। যতক্ষণ আমি নিজের কাছে সৎ আছি এবং শেষ মিনিট পর্যন্ত শতভাগ দিয়েছি, সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট। মানুষ বা কোনো পরিচিত ব্যক্তি কনটেন্ট বানানোর জন্য এসে খেলোয়াড়দের নিয়ে বাজে কথা বলবে, আমরা এসব বোকামিতে কান দিই না। গত ছয়-সাত বছর ধরে এই জাতীয় দলের হয়ে খেলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, আমরা সবসময় নিজেদের সেরাটা দিয়েছি।’
টুর্নামেন্টের আগে হাঁটুর চোট থেকে শুরু করে ফাইনালে নামার আগের শারীরিক অবস্থার করুণ চিত্রও তুলে ধরেন তিনি। সেখানে কোচ লিওনেল স্কালোনির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রোমেরো বলেন, ‘শুরুতে হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার পর আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। আমার প্রথম মনে হয়েছিল আমি বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছি। কিন্তু স্ক্যান করার পর জানা গেল যে এটা মেডিয়াল কোল্যাটারাল লিগামেন্টের সমস্যা এবং আমি কোয়ার্টার ফাইনাল বা শেষ ষোলোর আগেই ফিরতে পারব। ওয়াল্টার স্যামুয়েল আমাকে শান্ত থাকতে বলেছিলেন এবং স্কালোনি লিখেছিলেন, ‘থেমে যাও এবং সুস্থ হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার করো।’ আমি ভুগেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য সহায় ছিল। কোচ ও সতীর্থদের আস্থার মর্যাদা দিতে পেরেছি।’
বিশেষ করে ফাইনাল ম্যাচটিতে মাঠে নামার পেছনের রোমহর্ষক সত্য প্রকাশ করে রোমেরো জানান, কতটা শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি সেদিন খেলেছিলেন। ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আমার অ্যাকিলিস টেন্ডনে সমস্যা শুরু হয়, যা আজও আছে। ফাইনালের আগের প্রায় কোনো দিনই আমি ঠিকমতো অনুশীলন করতে পারিনি। পিল আর ইনজেকশন নিয়ে কোনোমতে মাঠে নেমেছিলাম, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আমার শরীর আর কুলিয়ে উঠছিল না। ওই পরিস্থিতিতে ফাইনালে নামাটা রাগের ছিল, কারণ আপনি সবসময়ই খেলতে চাইবেন, ফাইনাল থেকে তো আর না বলা যায় না। তবে যদি বুঝতাম যে আমি সতীর্থদের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছি, তবে নিজেই হাত তুলে মাঠ ছেড়ে অন্য কাউকে সুযোগ দিতাম। তবে আমি খেলার মতো প্রস্তুত ছিলাম বলেই নেমেছিলাম।’
এদিকে বিশ্বকাপের পুরো পথচলায় দলের খেলোয়াড়দের কতটা শারীরিক ধকল সইতে হয়েছে, তার এক লোমহর্ষক তালিকাও দেন এই ডিফেন্ডার। ‘পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আমাদের কত ইনজুরি ছিল! লিয়ান্দ্রো পারেদেসের হাড় ভেঙে গিয়েছিল, যা নিয়ে কেউ কথাই বলে না। ইংল্যান্ড ম্যাচের পর টেন্ডনের চোটের কারণে আমি নিজেই অনুশীলন করতে পারিনি। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও নাহুয়েল মলিনা একই সমস্যায় ভুগেছে, তাগলিয়াফিকো কোনোমতে ফিট ছিল এবং দিবুর আঙুল ভাঙা ছিল। আমরা নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলাম।’
ঠিক এই উজাড় করে দেওয়ার বার্তাটা দিয়েছিলে লিওনেল মেসিও, বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের পর মনুমেন্তালে তার বিদায়ী ভাষণে। সাবেক কাপ্তানের সুরেই তাই যেন সুর মেলালেন বর্তমান কাপ্তান।