ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনির্দিষ্টকালের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে হাজার হাজার রোগী ও স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। পার্কিং সুবিধার দাবিকে কেন্দ্র করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি এই ধর্মঘট ডেকেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) হাসপাতালে আসা রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল চত্বরে পার্কিং ব্যবস্থার দাবির আড়ালে, রোগীদের গলাকাটা ‘অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ চালুর পায়তারা মালিক সমিতির। মাসে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার উৎস এই অ্যাপ সার্ভিস বন্ধ হওয়ায় দিশেহারা যুবদলের নামধারী ইমন-বাদল সিন্ডিকেট।
সরেজমিনে সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ২ নম্বর ভবনের সামনে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
জরুরি বিভাগের সামনে সীমা আক্তার নামে এক রোগীর ভাই রেজাউল করিম অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কথা হয় তার সাথে। রেজাউল বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) মাওয়া রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আমার বোন। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার পর তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন এখানকার চিকিৎসকরা।’
‘তবে ২-৩ ঘণ্টা চেষ্টা করেও অ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করতে পারিনি। ৯৯৯-এ কল করেছিলাম। তবুও পাইনি। শেষে জরুরি বিভাগের সামনে থাকা ঢাকা মেডিকেলের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আমাদের বলেন, তিনি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে দিয়ে আসতে পারবেন। এরপর সেই গাড়িতে করেই এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি,’ বলেন তিনি।
সাভার থেকে আসা ব্রেইন স্ট্রোকের রোগী শাহীন গাজীকে অপেক্ষা করতে দেখা যায় জরুরি বিভাগের সিঁড়ির ওপর ট্রলিতে শুয়ে। তার ছোট ভাই শামীম গাজি বলেন, ‘এমআরআই করার জন্য লালবাগ ইবনে সিনা হাসপাতালে যেতে হবে। তবে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স খুঁজে পাচ্ছি না।’
শফিক আহমেদ নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, ‘পুরো হাসপাতালটিই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে। অ্যাম্বুলেন্সও তার বাইরে না। এখানে বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসব রোগী নিয়ে যেতে, সেটিও করতে পারছি না। এখানকার চালকেরা বাধা দিচ্ছে। রোগীদের জিম্মি করে তারা আন্দোলন করছে। সরকারের উচিত, তাদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।’
ধর্মঘট আহ্বানকারী ঢামেক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ‘হাসপাতালের বিগত পরিচালক রোগীদের সুবিধার জন্য অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করেছিলেন। তবে মালিক সমিতির সিন্ডিকেট মিলে সেই অ্যাপে ভাড়ার মূল্য তালিকা অনেক বেশি করেছিল। এক হাজার টাকার ভাড়া অ্যাপের দোহাই দিয়ে আদায় করা হতো আড়াই হাজার টাকা। আর আট হাজার টাকার ভাড়া আদায় করা হতো ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা।’
তিনি আরও জানান, ‘সেই অ্যাপ থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতিসহ কয়েকটি সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট একটি কমিশন আদায় করত। যেটি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। যা মাসে দাঁড়ায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকায়। হাসপাতালে নতুন পরিচালক আসার পর সেই অ্যাপ সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছেন। এজন্য সিন্ডিকেটের টাকাও বন্ধ হয়ে গেছে।’
আরেক অ্যাম্বুলেন্স মালিকের অভিযোগ, ‘হাসপাতাল চত্বরে পার্কিংয়ের দাবিটি মূলত এদের আইওয়াশ। মূল দাবিটি সেই গলাকাটা অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা। এখন হাসপাতালের ভেতরে পার্কিং করতে পারলেই তো পরে আবার অ্যাপ চালু করতে পারবে। তাই এত পায়তারা করছে তারা।’
‘তবে তারা রাজনৈতিক পদধারী। এজন্য যেসব অ্যাম্বুলেন্স মালিক এই দাবিদাওয়ার বিপক্ষে, তারা কোনো প্রতিবাদ বা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিতে পারছে না। এই ধর্মঘট কর্মসূচির যত খরচ রয়েছে, সবই বহন করছে সেই অ্যাপ কোম্পানির লোকজন,’ যোগ করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ধর্মঘট কর্মসূচির মূলে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির দুই নেতা। তারা দুজনেই ঢামেকের যুবদল ইউনিটের শীর্ষ পদ প্রত্যাশী। অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে পাওয়া মাসিক ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারাও তারাই করতেন।
হাসপাতালের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইমন আলী জানান, ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট চলমান রয়েছে। আজকে যদি আমাদের দাবি মেনে না নেয়, তবে আগামীকাল থেকে ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্সের মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হবে।’