সেঞ্চুরির অপেক্ষায় সাদমান

আর মাত্র ১ রান। টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি থেকে এতটা কাছে এসে দিনের খেলা শেষ করতে হবে, তা হয়তো ভাবেননি সাদমান ইসলামও। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে মিরপুরের আকাশে জমে থাকা কালো মেঘ আর আলোকস্বল্পতা এই বাঁহাতি ওপেনারের অপেক্ষা দীর্ঘ করেছে। গতকাল ৯৯ রানে অপরাজিত থেকেই প্রথম দিনের খেলা শেষ করেন তিনি। সব মিলিয়ে ৭৪ ওভারে ৩ উইকেটে ২১৩ রান তুলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে বাংলাদেশ। অথচ সেঞ্চুরির অপেক্ষায় একটি দীর্ঘ রাত কাটাতে হয়েছে সাদমানকে।

গতকাল তৃতীয় সেশনে প্রায় ৪৫ মিনিট বন্ধ ছিল খেলা। বিরতির পর বল মাঠে গড়ালেও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আলোকস্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই দিনের খেলা শেষ করেন আম্পায়াররা। ততক্ষণে ২১৯ বল খেলে ১০টি চারসহ ৯৯ রানে অপরাজিত সাদমান। তার সঙ্গে ১০ রান নিয়ে লিটন দাস আজ দ্বিতীয় দিনে ব্যাট করতে নামবেন। সাদমানের সেঞ্চুরির অপেক্ষা নিয়ে গোটা দলের উদ্বেগ গোপন করেননি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ‘আমরা পুরো দলই উদ্বিগ্ন। সবাই চাচ্ছিলাম, ওর যেন সেঞ্চুরিটা হয়ে যায়। টেস্ট ক্রিকেটে প্রায় ৩০টি ম্যাচ খেলে তার মাত্র দুটি সেঞ্চুরি। আমার মনে হয়, এই সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।’

প্রথম দিনের খেলা শেষে নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট সালাউদ্দিন। তবে মিরপুরের উইকেটে ম্যাচের গতিপথ দ্রুত বদলে যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি, ‘এখানে বোলারদের জন্য কিছু আছে। বোলাররা ভালো বল করলে এখানে অনেক সাহায্য পেতে পারে। দিনশেষে প্রথম দিনের জন্য ৩ উইকেটে আমাদের যে অবস্থান, সেটা ভালো। তবে এই টেস্টে যেকোনো সময় নাটক হতে পারে।’

টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা অবশ্য খুব একটা স্বস্তির ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার জেইডেন সিলস ও শামার জোসেফ নতুন বলে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে চাপে রাখেন স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের। ইনিংসের সপ্তম ওভারে সিলসের বলে সিøপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তানজিদ হাসান। ২৩ বলে তার সংগ্রহ ৭ রান। এরপর সাদমানের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে ৫৯ রানের জুটি গড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন মুমিনুল হক। কিন্তু ৫১ বলে ২৮ রান করে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন তিনি। জোমেল ওয়ারিকানের করা দ্বিতীয় বলে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে বড় শট খেলতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দেন মুমিনুল। অভিজ্ঞ এই ব্যাটারের একই ভুলের পুনরাবৃত্তিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন সালাহউদ্দিন, ‘আপনি প্রতিবারই একই ভুল করবেন, তখন হয়তো কোনো না কোনো জায়গায় সমস্যা আছে। কীভাবে এ প্রক্রিয়া থেকে বের হতে হবে, সেটা তাকে নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে। দুই বছরে যখন কোনো সেঞ্চুরি নেই, তখন আমিও আশা করব, পরবর্তী ইনিংসগুলোতে সে যেন সেঞ্চুরি করে।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘ওরা তো বাচ্চা না। আমরা বাচ্চাদের কোচিং করাই। ওদের বাচ্চা মনে করে বাচ্চাদের মতো কোচিং করাই। কিন্তু ওরা বাচ্চা না, ওরা নিজেরাই হয়তো বুঝতে পারে।’

মুমিনুল ফেরার পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ৪২ বলে ১৯ রান করে ওয়ারিকানের বলে সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন তিনি। ১১০ রানে তৃতীয় উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকে তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে দলকে এগিয়ে নেন সাদমান। দুজনের ব্যাটিংয়ে ইনিংসে ফেরে গতি। মুশফিকুর রহিমের আঙুলের চোটে পাওয়া সুযোগটা ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছিলেন হৃদয়। তবে পায়ের পেশিতে টান লাগায় মাঠেই চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। পরে একই সমস্যা দেখা দিলে আর ব্যাটিং চালিয়ে যেতে পারেননি। ব্যক্তিগত ৪২ রানের সময় স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন এই ব্যাটসম্যান। দিনের খেলা শেষে হৃদয়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আশাবাদী সালাউদ্দিন। তার প্রত্যাশা, আজ আবার ব্যাট হাতে নামতে পারবেন হৃদয়।

সাদমান অবশ্য নিজের ব্যাটিংয়ে কোনো তাড়াহুড়া করেননি। ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি বুঝে খেলেছেন, এড়িয়ে গেছেন অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি। তার ইনিংস নিয়ে সালাউদ্দিনের মূল্যায়ন, ‘সে উইকেটটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। পুরো ইনিংস দেখলে বোঝা যাবে, সে খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলেনি। কঠিন সময়টা পার করে নিজের নিয়ন্ত্রণে ইনিংস খেলেছে। অনেক দিন পর তার এমন একটা ইনিংস দেখলাম। আশা করব, সে যেন ইনিংসটা লম্বা করতে পারে।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানও মনে করেন, ম্যাচের পরবর্তী পরিস্থিতি বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে, ‘ভবিষ্যতে কী হবে, তা আমি অনুমান করতে পারি না। তবে এই উইকেটে দুই দলই ব্যাটিং ও বোলিং করার সুযোগ পাবে। আমাদের কাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। প্রথমে দেখতে হবে, আমরা বাকি উইকেটগুলো কীভাবে নিতে পারি। এরপর আমরা যখন ব্যাটিং করব, তখন পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।’

এদিকে বড় লক্ষ্য নিয়েই আজ ব্যাটিংয়ে নামবে বাংলাদেশ। নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এখন ২১৩ রানে ৩ উইকেট আছে। আশা করব, আমরা এই উইকেটে ৪০০-এর অধিক করতে পারব। সেটা করতে পারলে আমার মনে হয়, আমরা ভালো অবস্থানে থাকব।’ তবে শুধু প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং দিয়েই তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে চান না তিনি, ‘আমাদের পাঁচ দিনই ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। সেটা ব্যাটিং হোক, বোলিং হোক বা ফিল্ডিং হোক। এ ছাড়া টেস্ট ম্যাচ জেতা যাবে না। এক দিনের পারফরম্যান্স দিয়ে কিছু হবে না। যদিও এখনো আমরা চালকের আসনে।’