ব্যাংকের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব, সুশাসন এবং টেকসই অর্থায়নের চিত্র তুলে ধরে ২০২৫ সালের সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)। ব্যাংকিং খাতে প্রথমবারের মতো ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ সংস্করণসহ প্রকাশিত এ প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘ট্রান্সফর্মিং ইনটেন্ট ইনটু প্ল্যানেটারি ইমপ্যাক্ট’। এটি ইউসিবির তৃতীয় সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট।
সম্প্রতি ব্যাংকের করপোরেট অফিসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির। এ সময় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশের মানদণ্ড আইএফআরএস এস ১ এবং এস ২ (IFRS S1 & S2) অনুসরণ করে তৈরি এ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ইউসিবির পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত কার্যক্রম, জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই অর্থায়নের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউসিবি টেকসই অর্থায়ন খাতে ১৭,৯২৭ কোটি ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করেছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণের ৭২.২৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
একই সময়ে ব্যাংকটি গ্রিন ফাইন্যান্স বা পরিবেশবান্ধব খাতে ৪৮৮ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা বিতরণ করেছে। এ পরিমাণ ব্যাংকের মেয়াদি ঋণ বিতরণের ৩০.৪০ শতাংশ, যেখানে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ শতাংশ। ফলে বছর শেষে ইউসিবির গ্রিন ফাইন্যান্সের বকেয়া স্থিতি দাঁড়ায় ২,৭৪৪ কোটি ৩৭ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে সহায়তার অংশ হিসেবে ইউসিবি ২৭টি LEED সনদপ্রাপ্ত গ্রিন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি প্ল্যাটিনাম ও ১৩টি গোল্ড সনদপ্রাপ্ত। পাশাপাশি, দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি কার্যক্রমে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে ব্যাংকটি।
প্রতিবেদনে ইউসিবির কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের সহযোগিতায় ব্যাংকটি নিজস্ব কার্যক্রম থেকে সরাসরি ও জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ—অর্থাৎ স্কোপ ১ ও স্কোপ ২—হিসাব করেছে। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জয়েন্ট ইমপ্যাক্ট মডেল (JIM) ফাউন্ডেশনের কাঠামো ব্যবহার করে ঋণ ও অর্থায়নের মাধ্যমে সৃষ্ট নিঃসরণ বা স্কোপ ৩ পরিমাপ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউসিবির অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ ছিল ১,৯১২,২১২.০৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য (TCO₂e)। প্রতি কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে কার্বন নিঃসরণের ঘনত্ব ছিল ৩৭.৫২ টন TCO₂e।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকটি ঋণ মূল্যায়ন ও অর্থায়ন কার্যক্রমে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করছে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভৌত ঝুঁকি এবং কম-কার্বন অর্থনীতিতে রূপান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা জোরদার করছে। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে কম-কার্বন অর্থনীতিতে উত্তরণেও ভূমিকা রাখছে ইউসিবি।
অনুষ্ঠানে ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির বলেন, “জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি একটি দেশে পরিচালিত ব্যাংক হিসেবে ইউসিবি বিশ্বাস করে, মূলধনকে বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে হবে।”
পরিবেশগত উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণেও কাজ করছে ইউসিবি। বর্তমানে ব্যাংকটির ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎচালিত শাখা ও চারটি সোলার এটিএম রয়েছে। এ ছাড়া, দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৩০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং গ্রাম ও শহরের উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ৫০টি বিশেষায়িত সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স হেল্প ডেস্ক পরিচালনা করছে ব্যাংকটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউসিবির বিতরণ করা ঋণ দেশের বিভিন্ন খাতে দুই লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। এসব কর্মসংস্থানের প্রায় ৩০ শতাংশে রয়েছেন নারী কর্মী। এ ছাড়া, ২০২৫ সালে ব্যাংকটি জাতীয় কোষাগারে ১৮,০৩০.৫৫ মিলিয়ন টাকা জমা দিয়েছে।
ইউসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামদুদুর রশীদ বলেন, ‘ইউসিবিতে আমরা টেকসই ব্যাংকিংকে কেবল করপোরেট বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখি না; বরং একে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অপরিহার্য ভিত্তি মনে করি।’
ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ সংস্করণ চালুর মাধ্যমে ইউসিবি তার টেকসই কার্যক্রম ও অগ্রগতির তথ্য আরও সহজে পাঠক, বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীজনের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে।