বেদখলে নোবিপ্রবির ভূমি, অনিশ্চিত কোটি টাকার স্কুল প্রকল্প

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পরও অধিগ্রহণ করা ১ দশমিক ৩৩ একর জমি বেদখলে রয়েছে। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রকল্প। প্রায় ৮ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে চলতি অর্থবছরের ১ জুন থেকে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও জমি দখলে না থাকায় এর কার্যক্রম শুরু নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও প্রসাশনিক তথ্যানুযায়ী, নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার মাধ্যমে এই আইন অনুযায়ী ২০০৩-০৪ সালে নোবিপ্রবির জন্য ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি সরকারি গেজেটের মাধ্যমে জমিটি নোবিপ্রবির নামে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু অধিগ্রহণ করা ১০০ একরের মধ্যে সল্লা মৌজার ৭৬ নম্বর দাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিআইপি গেস্ট হাউজ সংলগ্ন ১ দশমিক ৩৩ একর জমি এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেদখলে রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জমিটির মালিকানা ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আব্দুস সাত্তারসহ কয়েকজনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরোধ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জমিটিকে বসতভিটা দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছেন। পরবর্তীতে গেজেট প্রকাশের পর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আব্দুস সাত্তারসহ অন্যরা ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। পরে ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রিটটি খারিজ করে রায় দেয় হাইকোর্ট এবং জমির বিষয়ে অপরিবর্তিত অবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল পিটিশন দায়ের করেছে।

২০০৮-০৯ সালের তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গড়িমসির কারণে উক্ত জমি দখলে আরও জটিলতা দেখা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি দখলে নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো সরকার কর্তৃক উক্ত সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে অধিগ্রহণ করা হলেও তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কুমার অধিকারীর আমলে জেলা প্রশাসক বরাবর জমি দখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণ করা জমির মূল্য ফেরত চেয়ে তিনটি তাগাদা পত্র দেওয়া হয়।

২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কাজী ফজলুল করিমের সাক্ষরিত এবং ২০০৯ সালের ৭ জুলাই ও ১০ ডিসেম্বর রেজিস্ট্রার প্রফেসর মো. মমিনুল হকের সাক্ষরিত তিনটি চিঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তবে এ বিষয়ে পরবর্তী কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্রে পাওয়া যায়নি। তৎকালীন প্রশাসনের এমন দুর্বলতার সুযোগে ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে জমির তৎকালীন মালিকরা ২১ জনের কাছে জমিগুলো হস্তান্তর করে। এতে জটিলতা আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে উক্ত সম্পত্তির নিয়ে দায়ের করা রিট পিটিশনটি লিভ টু আপিলে রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাবিত ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রকল্পটি পরিকল্পনা পাশ হয়। যা ২০২৬ সালের ১ জুনের মধ্যে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কাজ শুরু করে ২০২৮ সালের ২৭ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার সম্ভাব্য তারিখ ধরা হলেও এখনও কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। এর জন্য নির্ধারিত জমির বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কর্মকর্তা আশীষ শীল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির বিরুদ্ধে আব্দুস সাত্তারসহ অন্যরা রিট করেছিলেন। তবে ওই রিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই রায় এসেছে। আশা করি, আমরা দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব।

কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মহিনুজ্জামান বলেন, ‘আমরা জমির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জমি-সংক্রান্ত বিষয়টি সমাধানের মাধ্যমে প্রকল্পের পরবর্তী কাজ শুরু করার বিষয়ে আমরা আশাবাদী। পাশাপাশি দ্রুত দরপত্র আহ্বানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হবে।

বেদখলে থাকা জমি দখলে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, আমরা এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে ফলাফল পাব।