পুরনো ‘মডেলে’ মুক্তি নেই

আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এম.জি কিবরিয়া সম্প্রতি সমসাময়িক বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে একটা নিবন্ধ লিখেছেন। লেখাটি মূলত নীতিনির্ধারণীমূলক উপদেশমালা। তাই বিষয়টি কেবল নীতিনির্ধারক নয়, এমনকি সাধারণ পাঠককেও ভাবায় বলে আমার বিশ্বাস। আমরা বলে থাকি এবং সত্যি সত্যি তাই, চার দশক ধরে পোশাকশিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক। কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে এই খাতটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি ‘থেকে বিশ্বের প্রথম সারির পোশাক রপ্তানিকারকের আসনে রূপান্তরিত হয়েছে। এই সাফল্য অবশ্যই উদযাপন করার মতো। কিন্তু যে মডেল গতকালের সফলতা এনে দিয়েছে, সেই মডেল আগামীকালের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে এমন ধারণা ভুল, চাইকি বর্জনীয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে অনাদৃত, বৈরী বৈশ্বিক অর্থনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির ভেতরকার দুর্বলতায় পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সীমিত রপ্তানি ভিত্তি, অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ব্যাপকতা এবং অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটা দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। এই উপাদানগুলো আবার একে অপরকে বলীয়ান করে। তাই এখন কেবল দ্রুত প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট হবে না; বাংলাদেশকে খুঁজতে হবে উৎপাদনশীলতার নতুন উৎস। এক গবেষণা বলছে, বহু বিস্তৃত কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে রপ্তানি-তাড়িত শিল্পায়নের ওপর অতটা নির্ভরতা পড়ন্ত। তাই বেশিরভাগ মানুষের কর্মস্থল দেশজ সেবা খাতে দৃষ্টি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। অন্তত বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে তার অর্থ এই নয় যে, অনেকটা ‘অন্ধের যষ্টি’ রপ্তানি-তাড়িত কৌশলকে এখনই তাড়াতে হবে। এই দেশে রপ্তানি এখনো আমদানির খরচ মেটায়, প্রযুক্তিগণ প্রগতির চালক এবং বিশ্ববাজারের শৃঙ্খলায় চালিত। তবে ভাবতে হবে কেন এমনটি হলো, খুঁজতে হবে উপায়। এখন বাংলাদেশের দরকার একটা নতুন ‘গ্রোথ মডেল’, যার ভিত্তি হবে পারস্পরিক শক্তিবর্ধক চারটি স্তম্ভ । এক, একটা অধিকতর উৎপাদনশীল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি; দুই, প্রকৃত সক্ষমতা প্রদানকারী শিক্ষা; তিন, কার্যকর শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ; চার, অভ্যন্তরীণ এবং রপ্তানি উভয় খাতে বুদ্ধিমান ও চৌকস শিল্পনীতি গ্রহণ। মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের সুদিনগুলোতে বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে যখন বাজার ছিল বিস্তৃত, বাণিজ্য নিয়ম-কানুন বোঝা যেত এবং উন্নয়নশীল দেশের শ্রম নিবিড় দ্রব্যের চাহিদার দরজা ছিল খোলা। সেই বিশ^ বদলে গেছে। কারণ সরবরাহও শৃঙ্খলে ফাটল ধরেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি, যুদ্ধবিগ্রহের জন্য জ্বালানি, পরিবহন এবং খাদ্যবাজারে অস্থিরতা ইত্যাকার সমস্যায় আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির। অন্যদিকে আগামীতে হয়তো বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাড়বে, তবে শ্রম-ঘন পোশাক পণ্য নয় বরং এআই ব্যবহারকারী পণ্য ও সেবার প্রাধান্য নিয়ে যথা সেমিকন্ডাক্টর, সার্ভার। বাংলাদেশের জন্য এই ধাক্কাগুলো রপ্তানি, দরকারি আমদানি দ্রব্যে প্রবেশগম্যতা এবং বিদেশে কর্মসংস্থান সংকুচিত করে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। অটোমেশন এরই মধ্যে শ্রমের চাহিদা হ্রাস করেছে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের আগেকার পথটিও খোলা নেই বাংলাদেশের জন্য। অপরদিকে গার্মেন্টস উল্লেখযোগ্য সফলতা পেয়েছে বটে, তবে অন্যান্য রপ্তানি শিল্পের জন্য তুলনীয় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত হবে, রপ্তানি থেকে সরে না এসে এর উৎসগুলো বহুমুখী করার চেষ্টা চালিয়ে নেওয়া এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অলিগলিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। সুতরাং প্রস্তাবিত মডেলের প্রথম স্তম্ভ হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে গণ্য করা। শুধু রপ্তানি-তাড়িত উন্নয়ন কৌশল এই বিশাল শ্রমশক্তি উপেক্ষা করে। অর্থনীতির রূপান্তরের জন্য কেবল ক্ষুদ্রঋণ বা উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান যথেষ্ট নয়। ছোট ব্যবসার জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা, অর্থায়নের সুযোগ, উন্নত ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ। কৃষি খাতে প্রয়োজন উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, যান্ত্রিকীকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা। নির্মাণ, পরিবহন ও মেরামত সেবার ক্ষেত্রে প্রয়োজন উন্নত দক্ষতা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পেশাগত মানদণ্ড। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল আর্থিক পরিষেবাগুলো এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, তবে সেগুলোর অবদান কেবল ব্যবহারকারীর সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা ও নিট আয়ের উন্নতির নিরিখে মূল্যায়ন করা উচিত।

তবে স্বীকার করতে হবে যে, শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর মনোযোগ দেওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তা থেকে এমন কোনো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় না, যা দিয়ে যন্ত্রপাতি, জ্বালানি, সার ও প্রযুক্তি কেনা সম্ভব। আবার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে অভ্যন্তরীণ পরিষেবা খাতেরও প্রসার ঘটা সম্ভব নয়। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় খাতই প্রবৃদ্ধির পরিপূরক চালিকাশক্তি; একটি অন্যটির বিকল্প নয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জন প্রশংসার দাবিদার বিশেষত মেয়েদের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে। ‘শিক্ষিত বেকারের’ অনুপাত বেশ বেশি, শিক্ষার মান অনেক নিচে। শিক্ষানীতি আসলে শিল্পনীতিও বটে। কৃষি ও কারখানায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনার জন্য প্রয়োজন এমন কর্মী, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবস্থাপক, যাদের দক্ষতা ক্রমাগত আরও উন্নত ও জটিল। শ্রমশক্তির মধ্যে এই সক্ষমতার অভাব থাকলে, কোনো কর ছাড় বা শুল্ক সুবিধা দিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত কমে আসার প্রবণতা এই বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জরুরি করে তুলেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি হলো, দক্ষ হয়ে ওঠার আগেই হয়তো দেশের জনসংখ্যা বয়স্ক হবে। তাই পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরটি আর সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করবে না, বরং নির্ভর করবে মানুষ কতটা উৎপাদনশীলভাবে অবদান রাখতে পারছে, তার ওপর। তৃতীয় স্তম্ভ সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা। বাংলাদেশে দুর্নীতি অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে একটি কাঠামোগত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণ প্রাপ্তি, সরকারি কাজ (কন্ট্রাক্ট), জমি, লাইসেন্স বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশেষ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরিবর্তে প্রভাব বিস্তারের পেছনে বিনিয়োগ করছেন; আর সম্পদ যোগ্য ব্যক্তিদের কাছে না গিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে চলে যাচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, সুনিশ্চিত ও অনুমানযোগ্য নীতিমালা, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার (প্যাট্রোনেজ) অবসান ঘটাতে হবে। সিঙ্গাপুরের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, কীভাবে এমন সব প্রতিষ্ঠান যা দুর্নীতিকে কঠিন ও অলাভজনক করে তোলে, অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এই শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা হুবহু অনুকরণ করতে হবে এমন নয়। বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী কাঠামোর অভাব নেই; অভাব রয়েছে এমন কাঠামোর, যা সব দিকে সমানভাবে কার্যকর। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোকে প্রায়ই ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় এরা কেবল আগের শাসনামলের নেতা বা কর্মকর্তাদের পেছনেই ছোটে, অথচ বর্তমান ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের অন্যায়-অপকর্মের দিকে নজর দেয় না। যে বিচার ব্যবস্থা কেবল অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকে, তা প্রকৃত বিচার নয়; বরং এটি আইনি মোড়কে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একটি কৌশল মাত্র। দুর্নীতির কোনো দলীয় পরিচয় নেই। একটি বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাকে অবশ্যই দুর্নীতিবাজদের খুঁজে বের করতে হবে, তারা সরকারে, বিরোধী দলে, উচ্চপর্যায়ে বা নিম্নপর্যায়ে থাকুক।

সব শেষ স্তম্ভ, শিল্পনীতির ক্ষেত্রে সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রকে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে হবে, আবার সেই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হলে সেই সহায়তা প্রত্যাহার করতে হবে। এ ধরনের শৃঙ্খলা না থাকলে, শিল্পনীতি যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগকে পুরস্কৃত করে; আর্থিক খাত কেবল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সেবায় নিয়োজিত হয় আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। যে রাষ্ট্র নিজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে না, সে রাষ্ট্র তার সহায়তাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও শৃঙ্খলা আরোপ করতে ব্যর্থ হবে। মোট কথা, প্রণোদনা হতে হবে পরিমাপযোগ্য কৃতিত্বের নিরিখে, সময়-নির্দিষ্ট এবং অপচয়ে শাস্তিযোগ্য। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই পাঁচ স্তম্ভ সম্ভবত ঠেকাতে পারে আগত ‘সুনামি’।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

abdulbayes@yahoo.com