আইনি ব্যবস্থায় উগ্রপন্থা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ এএম

ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু এই মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রপন্থার ঝুঁকির মুখোমুখি হয়, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে  মানবাধিকার রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা সম্ভব? ডেইলি মেইল, ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ, বিবিসির বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা দুটি পৃথক ঘটনা। মোহাম্মদ ইয়াসিনকে ঘিরে বহিষ্কারসংক্রান্ত জটিলতা এবং মুনির ফারুকির সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত মামলাসহ কারাগারে তার মৃত্যু এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। ডেইলি মেইল-এর প্রতিবেদনে মোহাম্মদ ইয়াসিন নামে এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জার্মানিতে সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত অপরাধে কারাদণ্ড ভোগের পর তাকে ইরাকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে তার নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়। পরে তিনি ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে আসেন বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। অতীতে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তার অবস্থান সম্পর্কে কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জনস্বার্থের বিষয়। তবে কোনো ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠালে, নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের বাস্তব আশঙ্কা থাকলে ব্রিটিশ আইন এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ বহিষ্কারের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই সুরক্ষা গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বহিষ্কার করা যাচ্ছে না মানে, আর কিছু করা যাবে না এমনটি নয়। অপরাধের প্রমাণ থাকলে বিচার, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আইনসম্মত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। মূল প্রশ্ন মানবাধিকার থাকবে কি না, তা নয় বরং বহিষ্কার সম্ভব না হলে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র তার বৈধ বিকল্পগুলো কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করছে। এও মনে রাখা জরুরি, ছোট নৌকায় ব্রিটেনে প্রবেশ করা বা আশ্রয় চাওয়া নিজে থেকেই সন্ত্রাসবাদী পরিচয়ের প্রমাণ নয়। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। ম্যানচেস্টারের লংসাইট এলাকার মুনির ফারুকির ঘটনা অন্য একটি দিক তুলে ধরে। ২০১১ সালে তিনি সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত একাধিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। প্রসিকিউশনের বক্তব্য ছিল, তিনি অন্যদের সহিংস কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং সন্ত্রাসবাদী প্রকাশনা প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের গোপন তদন্তের মাধ্যমে তার কার্যকলাপ সম্পর্কে প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। আদালত তাকে চারটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় এবং ২০১৩ সালে তার আপিল খারিজ হয়।

ফারুকির পরিবার ও সমর্থকরা তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, তার ধর্মীয় প্রচারকে অপরাধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু আদালতের রায় তার বিরুদ্ধে আনা অপরাধগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাই এই বিতর্কে পরিবারের বক্তব্য আবেগের এবং বিচারিক সিদ্ধান্তকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে অর্থাৎ পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফারুকির ঘটনা দেখায়, উগ্রপন্থা মোকাবিলায় শুধু সন্দেহ বা মতাদর্শের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। বরং ফারুকির মৃত্যুকে ব্রিটিশ মানবাধিকার আইনের দুর্বলতার সরল প্রমাণ হিসেবে দেখার পরিবর্তে ঘটনাটি কারা-ব্যবস্থার দায়িত্ব, বন্দির অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আলোকে বিচার করা অধিক যুক্তিসংগত। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, ৬৯ বছর বয়সে কারাগারে ফারুকির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। তার পরিবার কারাগারে চিকিৎসা ও যথাযথ পরিচর্যা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। তবে তদন্তের ফলাফল ছাড়া এই অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেও একজন বন্দির জীবন, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কোনো অবহেলা প্রমাণিত হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ফারুকির মৃত্যু  প্রমাণ করে না যে, ব্রিটেনের মানবাধিকার আইন উগ্রপন্থিদের অপরাধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। বরং ঘটনাটি অপরাধের বিচার, দণ্ড কার্যকর এবং বন্দির অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বকে সামনে আনে। ইয়াসিনের ঘটনা বহিষ্কার ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন উত্থাপন করে, ফারুকির মামলা তুলে ধরে উগ্রপন্থি নিয়োগের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইন প্রয়োগ এবং কারাগারে বন্দির অধিকার রক্ষার বিষয়টি। দুটি ঘটনা এক নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের দায়িত্ব হলো সীমান্তে যথাযথ পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা-ঝুঁকির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, অপরাধের প্রমাণ থাকলে বিচার এবং বহিষ্কার আইনগতভাবে অসম্ভব হলে অন্য বৈধ ব্যবস্থা বিবেচনা করা।

মানবাধিকারকে অপরাধের দায়মুক্তির সনদ হিসেবে দেখা ভুল, আবার সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে আইনের সীমা অতিক্রম করাও অনুচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি হলো একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে কি না। ব্রিটেনের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ মানবাধিকার ও নিরাপত্তার মধ্যে একটি বেছে নেওয়া নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণœ রেখে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অপরাধ প্রমাণিত হলে বিচার করা এবং বন্দির অধিকার রক্ষা করাও যেন থাকে প্রশ্নহীন। কারণ আইনের শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে আইন যেমন মানবিক হবে, তেমনই তার প্রয়োগ হতে হবে কার্যকর, ন্যায়সংগত এবং সবার জন্য সমান।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত