বাঁধাধরা কোনো নিয়ম না থাকলেও সাধারণত এমন চিত্র দেখা যায় না। বাংলাদেশের অপরাজিত ব্যাটসম্যান নাঈম হাসান, যিনি আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিনে ১৮ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামবেন, তিনি গতকাল দলের মুখপাত্র হয়েও সংবাদ সম্মেলনে এলেন। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় তাকে। স্মিত হেসে সেসব বেশ ভালোভাবেই সামাল দেন নাঈম। যাওয়ার সময় নিজ থেকে বললেন, ‘আপনারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখেন, আমি আর জাকের (আলী) ভাই যাতে বড় ইনিংস খেলতে পারি।’
দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান জাকের-নাঈমের ওপর আপাতত বিশ্বাস রাখা ছাড়া উপায়ও নেই বাংলাদেশ দলের। ২৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করতে নেমে ধসে পড়ে স্বাগতিকদের ব্যাটিং বিভাগ। তানজিদ হাসান তামিম, তাওহীদ হৃদয়দের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ে ৫৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সেখান থেকে অবিচ্ছিন্ন ২৬ রানের জুটিতে দলকে টেনে নিচ্ছেন জাকের-নাঈম। এখন দলীয় সংগ্রহ ৭৯ রান। দুজনেই আজ সমান ১৮ রান করে নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামবেন। বাকি থাকা ৪ উইকেটে ১০৬ রানের লিডকে টেনে অন্তত ২০০ পর্যন্ত নেওয়ার লক্ষ্য বাংলাদেশ দলের।
এ নিয়ে নাঈম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব যত বেশি রান নিতে পারি। এখন আমি আর জাকের ভাই ব্যাটিং করছি, আমরা যদি লম্বা সময় খেলতে পারি, তাহলে যত বেশি রান নেব, ততই আমাদের জন্য ভালো। ২০০ রান হলে খুবই ভালো হবে। চেষ্টা থাকবে আরও বেশি করার।’ তবে স্বাগতিকদের এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দিতে চায় না ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দলটির ব্যাটিং কোচ ফ্লয়েড রাইফার বলে গেছেন, ‘আমরা যদি ১২৫ রানের লক্ষ্য পাই, তাহলে আমার মনে হয় এই উইকেটে সেটা তাড়া করা সম্ভব। সেজন্য শুরুতেই উইকেট নিতে হবে। আগামীকাল (আজ) প্রথম ঘণ্টাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই জুটি ভাঙতে পারলে আমরা দ্রুত কাজ শেষ করতে পারব।’
প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান করে বাংলাদেশ দল। এরপর সফরকারীদের ২৪৫ রানে গুটিয়ে দেয়। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সেই সুবিধা কাজে লাগানোর বদলে নিজেরাই বিপদে পড়েন নাজমুল হোসেন শান্তরা। মিরপুরের উইকেটে স্পিনাররা যথেষ্ট সহায়তা পাচ্ছেন। বল ঘুরছে, কোথাও কোথাও বাউন্সও থাকছে অসমান। চতুর্থ ইনিংসে এই উইকেটে ব্যাট করা ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য সহজ হবে না, বাংলাদেশের বোলারদের সামনে সুযোগ থাকবে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আগে লড়াইয়ের পুঁজি গড়তে হবে।
সে দায়িত্ব এখন জাকের-নাঈমের কাঁধে। এরপর আর কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান নেই। যদিও জাকেরের এই ম্যাচে খেলারই কথা ছিল না। ফিল্ডিংয়ের সময় পাওয়া মুমিনুল হকের মাথার চোটে কনকাশন বদলি হিসেবে ব্যাট করতে নামেন তিনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে নিয়মিত ব্যাটসম্যানরা দায়িত্ব নিতে পারেননি, সেখানে আর তিনিই বা কী করবেন!
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটাই ছিল হতাশাজনক। প্রথম ইনিংসে সাত রান করা তামিম এবার শূন্য রানে আউট হন। এরপর সাদমান ইসলাম ১৩ রান করে রস্টন চেইসের বলে বোল্ড হন। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা এই ওপেনারের কাছ থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে বড় ইনিংসের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দলের প্রয়োজনের সময় তিনি টিকতে পারেননি। একই ওভারে হৃদয়ও ফিরে যান। ক্রিজে নেমে প্রথম বল ডট খেলার পরের বলেই বড় শট খেলতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দেন তিনি। হৃদয়ের খামখেয়ালি ব্যাটিংয়ে উইকেট বিলিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠলে কৌশলী পথে হাঁটেন নাঈম, ‘ওর মনের মধ্যে কী চলছিল, সেটা তো আমি জানি না। এটা আমাকে জিজ্ঞেস না করলে ভালো হয়। আমি ব্যাটিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ড্রেসিংরুমের অবস্থা দেখিনি।’
অধিনায়ক শান্তও বড় কিছু করতে পারেননি। এরপর জোমেল ওয়ারিক্যানের স্পিনে বিদায় নেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। লিটন করেন ৪ রান, মিরাজের ব্যাট থেকে আসে ৯ রান। একের পর এক উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস যখন বিপর্যস্ত, তখন স্বাগতিকদের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জাকের-নাঈম। উইকেট যেভাবে স্পিনারদের জন্য স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে, তাতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংই বেছে নিতে পারেন তারা। এমন আভাস মিলেছে নাঈমের কণ্ঠে, ‘স্কোর করার জন্যই খেলতে হবে। কারণ বল তো টার্ন করছে। স্কোর যখন চালু থাকবে, তখন বোলার চাপের মুখে থাকবে।’ এমনকি জয়ের সম্ভাবনার কথাও শুনিয়ে গেছেন তিনি, ‘আমরা যদি ভালো সংগ্রহ দাঁড় করাতে পারি, সবই (জয়) সম্ভব।’
ব্যাট হাতে স্বপ্ন দেখানোর আগে বোলিংয়ে বাংলাদেশের হয়ে সর্বাধিক ৪ উইকেট নেন নাঈম। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম নেন দুটি করে উইকেট। একপর্যায়ে ৫ উইকেটে ২১৩ রান করা ক্যারিবীয়রা শেষ পর্যন্ত ২৪৫ রানে অলআউট হয়। ২৭ রানে লিড পায় বাংলাদেশ। অথচ সেই লিড বাড়ানোর মতো ব্যাটিং করতে পারছে না তারা। বোলারদের পরিশ্রমের পর ব্যাটসম্যানদের এমন ব্যর্থতা দলের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।