গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ সাত দফা দাবি পূরণ না হলে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের দিকে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। লংমার্চের পথে বিভিন্ন সমাবেশে জোটের নেতারা বলেছেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জীবন থাকতে জাতির সঙ্গে বেইমানি করব না।’ প্রয়োজনে আন্দোলন আরও জোরালো করে ঢাকামুখী কর্মসূচি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এদিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে পথসভা করে সাত দফা আদায়ের ঘোষণা দিয়েছে জোট।
গতকাল শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চ। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে সহস্রাধিক গাড়ির বহর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন জোটের নেতারা। পথে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া, বাগেরহাটের ফকিরহাটের নওয়াপাড়া ও কাঁটাখালী এবং খুলনার বিভিন্ন স্থানে পথসভা হয়। নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরেও কয়েকটি স্থানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন নেতারা।
উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাত দফার মধ্যে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নই প্রধান দাবি। এ রায় বাস্তবায়ন হলে বাকি ছয়টি দাবি নিয়ে পরিস্থিতি তৈরি হতো না। জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হবে। তিনি বলেন, তারা ব্যক্তিগত বা দলীয় দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেননি; এসব জনগণের দাবি। আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠছে উল্লেখ করে সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করে সংস্কার করতে হবে, অন্যথায় সরকারকে গদি ছাড়তে হবে। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম। এ ছাড়া জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বক্তব্য দেন।
এদিকে উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির কোনো নেতা ছিলেন না। পরে দলটির প্রতিনিধি হিসেবে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আবদুল হান্নান মাসউদ এবং যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজ বহরে যোগ দেন। নাওডোবার পথসভায় বক্তব্য দেন আরিফুল ইসলাম আদীব।
ঢাকা থেকে বের হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় পথসভায় বক্তব্য রাখেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছে, অথচ সরকার তা মানছে না। জনগণকে অপমান ও প্রতারণা করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক পেতে গুলি নেওয়া এ জাতি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। জনগণ পাশে থাকলে সাত দফা দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। একই সভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, মামুনুল হক ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদসহ জোটের নেতারা।
এরপর ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে বহর পৌঁছায় গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া মোড়ে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে সেখানে পথসভায় বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। ছাদখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে দেওয়া তার বক্তব্য শুনতে জড়ো হয় কয়েক হাজার মানুষ। তিনি বলেন, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়াই তাদের লক্ষ্য। সাত দফা দাবি আদায় না করে তারা ঘরে ফিরবেন না। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। একই সভায় মামুনুল হক বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ে সাত দফা নিয়ে তারা মাঠে নেমেছেন। দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে সাত দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে; সে জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
গোপালগঞ্জে পথসভাটি লংমার্চের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আগে ঘোষিত কর্মসূচিতে জেলায় কোনো পথসভা রাখা হয়নি। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যে বহরটি জেলার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে যাত্রাপথে কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া মোড়ে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতিতে সভা হয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলায় ১১ দলের এই কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে আলাদা তাৎপর্য তৈরি করে।
গোপালগঞ্জের পর বাগেরহাটের ফকিরহাটের নওয়াপাড়া মোড়ে দুপুর দেড়টায় অনির্ধারিত পথসভায় বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। এরপর কাঁটাখালী মোড়ের পথসভায় অংশ নেন জোটের নেতারা।
খুলনার বাবরী চত্বরের সমাবেশে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও লুটপাট বন্ধ এবং জুলাই শহীদদের হত্যার বিচারের দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। ‘জুলুমবাজদের পতন হবে, জনগণের বিজয় হবে। আমরা ১১ দলের বিজয় চাই না, জনগণের বিজয় চাই। জীবন থাকতে জাতির সঙ্গে বেইমানি করব না।’ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। প্রয়োজনে খুলনা থেকে ঢাকামুখী কর্মসূচি দেওয়া হলে গ্রামের মানুষকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
১১ দলের সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
শনিবার সন্ধ্যায় যশোর শহরের মুড়লী মোড়ে পথসভা করে ১১ দলীয় ঐক্য। এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সাত দফা দাবির সমাধান না হলে চলমান আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের এক দফায় রূপ নিতে পারে। ‘আমরা সরকারকে সেইটুকু সময় দিতে চাই। সংসদে বসেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই হত্যাকা-ের দ্রুত বিচারসহ সাত দফা দাবির সমাধান করতে চাই। কিন্তু তা না হলে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আবারও গণবিপ্লবের ডাক দেওয়া হবে। প্রয়োজনে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের ডাক দিতে আমাদের বাধ্য করবেন না।’
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আট মাসেই সরকার দেশ ধ্বংস করে দিয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যে জায়গায় ছিল, সেখানে এখন ছাত্রদল-যুবদল বসেছে। শুধু নাম বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি। দ্রব্যমূল্য, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তৈরি হয়েছে। ১০ বছরেও যা হয়নি, এই সরকার আট মাসেই তা করেছে।
এনসিপির নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমরা এমন এক সময় কথা বলছি, যখন আইজিপি আমাদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখায়। ক্রসফায়ার যদি দিতে হয় তাহলে যারা চাঁদাবাজি করছে তাদের দিতে হবে। যারা ফ্যামিলি কার্ডের নামে অনিয়ম করছে তাদের দিতে হবে। যারা চাকরির কথা বলে ঘুষ নেয় তাদের দিতে হবে ক্রসফায়ার।
পথসভা শেষে জামায়াতের আমিরের নেতৃত্বে লংমার্চের গাড়িবহর ঝিনাইদহের উদ্দেশে যাত্রা করে। এ সময় বহরটি মণিহার, বারান্দীপাড়া, শেখহাটি হাইকোর্ট মোড়, নতুন উপশহর, খাজুরা বাসস্ট্যান্ড, পালবাড়ী, চূড়ামনকাটি ও সাতমাইল হয়ে কালীগঞ্জ অতিক্রম করে। পথে সড়কের দুই পাশে নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে লংমার্চের বহরকে স্বাগত জানান।
এরপর লংমার্চের বহর ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে যায়। সেখানে পথসভা করে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। রাতে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা।