আয়ু ১২ বছর, গতি ২৫ কিমি

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম

সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার জন্য নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। এতে ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। যাত্রী ধারণক্ষমতা, নিবন্ধন, চলাচলের এলাকা, চালকদের প্রশিক্ষণ, ব্যাটারি চার্জিং ও নিরাপত্তার বিষয়েও নতুন শর্ত দেওয়া হয়েছে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। নতুন বিধিমালা দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জারি করা এ-সংক্রান্ত আগের বিধিমালাটি রহিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-রিকশার আয়ুষ্কাল বেশি হওয়ায় লক্কড়-ঝক্কড় রিকশার সংখ্যা বাড়তে পারে। তাছাড়া এর বিধানগুলো বস্তবায়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা। বিধিমালা কার্যকর করতে পারলে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এই যানবাহনে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে বলেও মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন বিধিমালায় বিদ্যমান অটোরিকশাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। এক এনআইডিতে একাধিক রিকশা নিবন্ধনের সুযোগের ফলে বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীদের প্রভাব বাড়তে পারে, যা প্রান্তিক চালকদের স্বার্থের পরিপন্থী। এ ছাড়া আবাসিক এলাকা ও অভ্যন্তরীণ সড়কে গতিসীমা নির্ধারণ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং আইন অমান্যের শাস্তির বিষয়েও বিধিমালায় ঘাটতি রয়েছে। নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, চলাচলের এলাকা ভাগ করা এবং সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয় জরুরি।’

নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে নিবন্ধন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলতে পারবে না। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন নেওয়া যাবে। আগের বিধিমালায় এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ তিনটি। প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।

দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা এবং চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার জন্য ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নবায়ন ফি যথাক্রমে ৪ হাজার ও ৫ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের ফি এক হাজার টাকা। নিবন্ধন ও নবায়ন থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় হিসেবে গণ্য হবে।

ই-রিকশার নিবন্ধনের আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করে থাকলে তিনি নিবন্ধনের যোগ্য হবেন না। নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত ছবি, নির্ধারিত ফি জমার রসিদ ও ফিটনেস সনদসহ আবেদন করতে হবে। কর্তৃপক্ষ আবেদন যাচাই করে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেবে। আবেদন নামঞ্জুর হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যাবে।

নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের বিধিমালায় ই-রিকশার কার্যকর মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ওই মেয়াদ শেষে ই-রিকশা স্ক্র্যাপ বা বিনষ্ট করার বিধান ছিল। নতুন বিধিমালায় ১২ বছর পূর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে। তবে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ১২ বছর হলেও নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে।

আগের বিধিমালায় চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুইজন যাত্রী বহনের সীমা ছিল। নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার আকার ও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী দুই অথবা চারজন যাত্রী বহনের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নেওয়া যাবে না। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ২৫ কিলোমিটার করা হয়েছে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং এবং বেআইনিভাবে লেন পরিবর্তন করা যাবে না। ৪০ ডেসিবলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদ- ও নিরাপত্তাবিষয়ক নকশা অনুসরণ করতে হবে। নিবন্ধন ও নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফিটনেস সনদ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলোর কাঠামো বুয়েটের নির্ধারিত মান অনুযায়ী সংশোধন করে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে অনুমোদন দেওয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বীমার আওতায় আনার বিধানও রাখা হয়েছে।

চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে নতুন বিধিমালায়। কর্তৃপক্ষ স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশার রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে পারবে।

এদিকে, জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডর এবং কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে না। ফুটপাতেও চলাচল নিষিদ্ধ। সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে জোনভিত্তিক চলাচলের এলাকা, রুট, ই-রিকশার সংখ্যা ও রং নির্ধারণ করবে। এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না। প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের সুপারিশ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি থাকবে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, বুয়েট ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা থাকবেন। বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদ- ও নিরাপত্তাবিষয়ক নকশা যাচাই করে কমিটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের সুপারিশ করবে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উৎপাদন লাইসেন্স দেবে।

এ ছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তফসিলি ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদন ও সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে চালক ও মালিকদের ঋণসহায়তা দিতে পারবে।

ব্যবহৃত বা অকার্যকর ব্যাটারি উন্মুক্ত স্থান, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে ফেলা যাবে না। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করতে হবে এবং অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কাজে নিয়োজিত হতে পারবে না। পুরনো বা অকার্যকর ব্যাটারি অনুমোদিত এজেন্ট, ডিলার বা সংগ্রহকারীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

বিধিমালার শর্ত অনুযায়ী, ব্যাটারি চার্জের জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট অথবা নির্দিষ্ট গ্যারেজ ব্যবহার করতে হবে। এসব চার্জিং পয়েন্টে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিড সংযোগের পাশাপাশি সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিধানও রাখা হয়েছে। চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে যানবাহন থামিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে হবে এবং ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। পুলিশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে অবহিত করবে। নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো, অনুমোদিত গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনুমোদনহীন ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন, নিষিদ্ধ সড়কে চলাচল, বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অপরাধের জন্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত