আলো হৃদয়-হরা

প্রতাপ শেখর মোহন্ত

আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা।

আলো নয়ন-ধোওয়া আমার, আলো হৃদয়-হরা।

মাঝেমধ্যে আলোয় ভেসে যাওয়ার মধ্যেও থাকে এক নীরব প্রশান্তি। সেখানে চোখ ধাঁধানো ঝলক নেই, নেই আলো-অন্ধকারের সংঘাত, কিংবা ছায়ার শাসন; চেনা পৃথিবী যেন ঢেকে যায় শুভ্রতার এক মায়াবী আবরণে। কবিগুরুর পঙক্তির মতো সেই আলো যেন শুধু চোখে এসে থামে না, তার কোমল স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ে মনের গভীরেও। আলোকচিত্রেও যখন আলো-আঁধারির চেনা ব্যাকরণকে দূরে ঠেলে দিয়ে শুধু ভুবন-ভরা আলোর উৎসবকে ফ্রেমে ধারণ করা হয়, তখনই জন্ম নেয় ‘হাই-কী’। আলো সেখানে শুধু দৃশ্য দেখায় না, বদলে দেয় তার মেজাজও।

আমরা প্রায়ই ছবির নাটকীয়তা খুঁজি গাঢ় ছায়া আর আলোর বৈপরীত্যে। অথচ সব গল্প উচ্চকণ্ঠে বলা হয় না; কখনো মৃদু উচ্চারণেই ধরা পড়ে গভীরতর অনুভব। হাই-কী সেই মৃদু স্বরের ছবি, যেখানে আলোই মূল গল্পকার। উজ্জ্বল টোন হয়ে ওঠে তার প্রধান সুর, ছায়া থাকে কোমল, আর পটভূমি অপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ সরিয়ে বিষয়টিকে জায়গা করে দেয় নিঃশব্দে। তবে ঔজ্জ্বল্যের আধিক্য মানেই অতিরিক্ত এক্সপোজার নয়। শুভ্রতার ভেতরেও থাকতে হয় সূক্ষ্ম টোনের ফারাক, পালকের ভাঁজ কিংবা অবয়বের গড়ন। সব সাদা একাকার হয়ে গেলে আলো আর দৃশ্যের ভাষা থাকে না হয়ে ওঠে অর্থহীন উজ্জ্বলতা।

হাই-কী ছবির কোমল আবহ তৈরি হয় নরম, ছড়িয়ে পড়া আলো এবং স্বতঃস্ফূর্ত উজ্জ্বল টোনের সুষম বিন্যাসে। মূল আলো বা ‘কী লাইট’ প্রথাবদ্ধ নিয়মের চেয়ে কিছুটা ‘হাই’ বা চড়া; তাই এমন নামকরণ হলেও এক্সপোজার নির্ধারণের সময় খেয়াল রাখতে হয়, উজ্জ্বল অংশের ডিটেইল যেন হারিয়ে না যায়। অতিরিক্ত আলোয় একবার তা হারিয়ে গেলে সম্পাদনার সময় হাইলাইট, হোয়াইট বা ছায়ার মাত্রা বদলেও কাক্সিক্ষত রূপ ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই আলো, বিষয়বস্তু ও পটভূমির পারস্পরিক সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাই-কী মানেই শুধু সাদা পটভূমি নয়; শুভ্রতার আধিক্যের মধ্যেও পটভূমি থেকে বিষয়বস্তুর দৃশ্যমান বিভেদ থাকা চাই। পোর্ট্রটে কিংবা ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতে বহুল ব্যবহৃত এই নান্দনিক ভাষা প্রকৃতির অবারিত ক্যানভাসেও তৈরি করতে পারে এক অপার্থিব দৃশ্যানুভূতি বিশেষত কোনো সাদা পাখি যখন আকাশের বিপুল শূন্যতায় ডানা মেলে।

২০২০ সালের এক সকালে দিনাজপুরে করতোয়ার তীরে এমনই এক উড়ন্ত বককে ক্যামেরায় ধরেছিলাম। হাই-কী বিষয়ে তাত্ত্বিক ধারণা থাকলেও ছবিটি তোলার সময় অবচেতন মনেও সে ভাবনা ছিল না। পরে কম্পিউটারের পর্দায় যখন বকটি আবার ডানা মেলল, মনে হলো, সে যেন দৃশ্যমান পৃথিবীর কোলাহল পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে এক নিস্তব্ধ পরিসরে। নদীচরের ঘাস নেই, জলের চঞ্চল রেখা নেই, নেই অন্য কোনো অনুষঙ্গ শুধু ধূসর-সাদার মৃদু বিস্তার, আর তার বুক চিরে উড়ে চলা সফেদ বক।

ফ্রেমের দুই পাশে প্রসারিত দুটি ডানা তৈরি করেছে প্রায় নিখুঁত প্রতিসাম্য, যেন এক জীবন্ত জ্যামিতিক নকশা। অথচ সে বিন্যাস নিথর নয়। পালকে পালকে আলো আলতোভাবে গড়িয়ে যাওয়ায় প্রতিটি রেখা আলাদা হয়ে উঠেছে; ডানার নিচের ধূসর আভা দিয়েছে গভীরতা। ঊর্ধ্বমুখী চঞ্চু আর টান টান পা দুটি যেন শরীরটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। পাখিটির গতি থেমে গেছে ক্যামেরায়, কিন্তু ডানার বিস্তার যেন জানিয়ে দেয়, তার উড়ে চলা শেষ হয়নি। সে যেন ফ্রেমের গণ্ডি পেরিয়ে ছায়ার মায়াকে তুচ্ছ করে ছুটে চলেছে অসীম শুভ্রতার দিকে।

এই ছবিতে ফাঁকা পটভূমি কি কেবলই শূন্যতা? বরং তার বিস্তৃতি বকটিকে ঘিরে তৈরি করেছে এক নীরব পরিসর। দৃষ্টিকে সরিয়ে নেবার মতো কিছু অবশিষ্ট না থাকায় চোখ সরাসরি গিয়ে থামে ডানার রেখায়, পালকের কোমলতায়, উড়ে চলার ভঙ্গিতে। আলো পাখিটিকে শুধু সাদা করে তোলেনি, একঘেয়েমি দূর করে এনে দিয়েছে আশ্চর্য ত্রিমাত্রিকতা। ফ্রেমে আলোর কোনো দৃশ্যমান উৎস নেই; মনে হয়, পাখিটি যেন নিজের ভেতর থেকেই ছড়িয়ে দিচ্ছে এক স্বর্গীয় আভা। সঙ্গে ডানার সেই জ্যামিতিক ব্যাপ্তি আর নিপাট সাদা পটভূমি এই মেলবন্ধনেই দর্শক খুঁজে পান ক্ষণিকের মুক্তি ও হালকা হওয়ার অনুভূতি। বকটি তখন আর নিছক বন্যপ্রাণের একটি প্রতিকৃতি থাকে না। সে যেন হয়ে ওঠে মুক্ত ডানার এক পরম ইশতেহার, স্বাধীনতার এক নীরব অভিব্যক্তি।

কিছু ছবি গল্প খোঁজে ছায়ার গভীরে, আর কিছু ছবি কোমল কাব্য হয়ে ওঠে শুধুই নরম আলোর অক্ষরে। হাই-কীর সৌন্দর্য হয়তো এখানেই সবকিছু দেখিয়ে নয়, আলোর স্রোতে অপ্রয়োজনীয়কে ভাসিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয়টুকুকে আরও নিবিড় করে তোলার মধ্যে। চারপাশের কোলাহল যখন থেমে যায়, ফ্রেমের বিন্যাসকে সম্পূর্ণ করতে একটি পাখির ডানাই তখন যথেষ্ট। তার শুভ্র বিস্তারে যেন ধরা থাকে আমাদেরও এক নীরব আকাক্সক্ষা পৃথিবীর ভার পেছনে ফেলে, একবার অন্তত, আলোর দিকে উড়ে যাওয়ার।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা