এলো ৭ প্রবাসীর মরদেহ

আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেল

পথের দিকে তাকিয়ে আছেন নার্গিস বেগম। কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, আবার কখনো পাথরের মতো নির্বাক। গতকাল শনিবার সকাল থেকেই নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকায় তার বাড়িতে প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের ভিড়। সবার অপেক্ষা কখন নার্গিসের ছেলে শাহিনের মরদেহ গ্রামে ফিরবে। অবশেষে শাহিনের নিথর দেহ বাড়িতে ফিরল বিকেলে।

শাহিনের মা ৬০ বছর বয়সী নার্গিস বেগম বারবার বলছিলেন ‘আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেল। আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম, এখন বাঁচব কী করে?’

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকা-ে ১৬ বাংলাদেশি প্রবাসী মারা যান। এর মধ্যে ১২ জনের বাড়িই নওগাঁ জেলায়। ২৭ আগস্ট ৯ জনের মরদেহ দেশে আসে। গতকাল শনিবার পৌঁছায় বাকি সাতজনের মরদেহ। এর মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নওগাঁয় এবং বাকি দুজনের বাড়ি নাটোরে।

গতকাল যাদের মরদেহ আনা হয়েছে, তারা হলেন নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী। নাটোরের দুজন হলেন নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুর গ্রামের রব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন এবং দীঘিরপাড় গ্রামের জাকের আলীর ছেলে শামীম।

মরদেহগুলো গতকাল শনিবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছে। এরপরই জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছানোর পর স্বজনদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাদের শেষবারের মতো এক নজর দেখতে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের পাশে ভিড় করতে থাকেন স্বজন ও স্থানীয়রা।

নিহত শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন জানান, শাহিনের জীবন শুরু থেকেই ছিল সংগ্রামের। সে মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারায়। এরপর মায়ের আঁচলে থেকে অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছে।

বিয়ের পর সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে এ বছরের এপ্রিলে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাহিন। দেশে রেখে যান স্ত্রী, ছয় বছরের ছেলে, আট মাস বয়সী মেয়ে আর বৃদ্ধ মাকে।

নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘মারা যাওয়ার তিন দিন আগে ছেলেটা প্রথমবার টাকা পাঠাতে চেয়েছিল। ১২ তারিখে ৩২ হাজার টাকা দেবে বলেছিল। বলেছিল, ২০ হাজার টাকা দিয়ে ঋণের কিস্তি শোধ করতে, বাকিটা দিয়ে সংসারের কেনাকাটা করতে। কিন্তু সেই টাকা পাঠানোর আগেই আগুনে পুড়ে মারা গেল শাহিন।’

শাহিনের মাসহ নিহত পাঁচ পরিবারেই এখন একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে ঋণের বোঝা কে টানবে, শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে? পরিবারগুলো সরকারি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং ঋণ মওকুফের ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।

আত্রাইয়ের সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলী ছিলেন পরিবারের একমাত্র আশা। তার স্ত্রী পারভীন আক্তার জানান, ছয় মাস আগে সাড়ে ৬ লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। চোখে ছিল একটাই স্বপ্ন স্বামী বিদেশে গিয়ে ভালো আয় করবেন, ঋণ শোধ হবে, সন্তানদের মুখে হাসি ফুটবে এবং সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। ভেজা কণ্ঠে পারভীন বলেন, ঋণের এক লাখ টাকাও শোধ করতে পারেননি। একমাত্র ভিটাবাড়িটি মহাজনের কাছে বন্ধক রয়েছে। এখন ঋণ শোধ না হলে সেই বাড়ি হাতছাড়া হবে। মাথার ওপর ছাদ হারালে কোথায় যাবেন, কীভাবে বাঁচবেন এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তার জানা নেই।

আত্রাইয়ের মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকের কফিন বাড়ির উঠানে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে শোকে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে দুই হাতে বুক চেপে ধরে আহাজারি করতে থাকেন মিনহাজের মা পারুল আক্তার। কখনো কফিনের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন ছেলের সঙ্গে, আবার কখনো আকাশের দিকে মুখ তুলে বিলাপ করছিলেন। তার কান্নায় থমকে যায় উঠান জুড়ে দাঁড়ানো মানুষগুলোও। প্রতিবেশী ও স্বজনরা কেউ চোখ মুছছিলেন, কেউ ঠোঁটে আঙুল চেপে নির্বাক তাকিয়ে ছিলেন। ছোট ছোট শিশুরা কফিনের গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। স্বজনরা কোনোক্রমেই থামাতে পারছিলেন না পারুলের কান্না।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, অগ্নিকা-ে নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা, পরিবহন ও দাফনের পুরো ব্যয় সরকারিভাবে বহন করা হয়েছে। এবার সরকারিভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি রাখা হয়নি। পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ করে নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে দাফন সম্পন্ন করেন। 

তিনি বলেন, পাশাপাশি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। শুক্রবার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। নিহতদের পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রশাসন সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।

নাটোরে দুই প্রবাসীর দাফন সম্পন্ন : সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নিহত নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দুই প্রবাসী শামীম হোসেন ও সাব্বির হোসেনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নিহত শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ঋণ-ধার করে, এমনকি জমি বিক্রি করে সন্তানদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন । কিন্তু পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া সেই মানুষ ফিরেছেন নিথর দেহে। এখন দীর্ঘশ্বাস আর কান্না ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

সাব্বিরের পরিবারের অভিযোগ, সরকারি পর্যায় থেকে সামান্য আর্থিক সহায়তা পাওয়া ছাড়া পরবর্তী সময়ে আর কেউ তাদের খোঁজখবর নেননি। জনপ্রতিনিধিরাও পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখা যায়নি বলে দাবি তাদের। খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহগুলো গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছালে বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার বলেন, শামিম ও সাব্বিরের মরদেহ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।