ভুটানে ১০৮টি বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ (জাংচুব চোরতেন) স্থাপনের ঐতিহাসিক আয়োজন ঘিরে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। চার দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এরই মধ্যে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। আজ রবিবার (১ নভেম্বর) দেশটির গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটিতে (জিএমসি) শুরু হয়েছে এ আয়োজন, চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের পরিকল্পনায় গড়ে উঠছে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও দেশটির আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ এ নগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ভুটানিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৪ জন নিবন্ধন করেছেন। তবে এ তালিকায় শিশু ও নিবন্ধন ছাড়াই আসা দর্শনার্থীদের হিসাব রাখা হয়নি। ফলে অনুষ্ঠানে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে।
আয়োজনটি ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহও তৈরি হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪০ জন সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
১ নভেম্বর রাত ৩টায় ১০৮টি বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ (জাংচুব চোরতেন) স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। প্রতিটি স্তূপের উচ্চতা হবে ১৫ মিটার। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক ‘ইয়োজা’ নামের একটি ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ প্রথার উদ্বোধন করবেন। এ প্রথায় ভিক্ষুদের ভিক্ষা ও উপহার দেওয়া হয়।
পরবর্তী তিন দিন বিশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণে প্রার্থনা, আশীর্বাদ ও আধ্যাত্মিক দীক্ষাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে।
বিচারব্যবস্থা ও বিনিয়োগে অগ্রগতি
গত ৩০ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির গভর্নর দাশো ড. লোটে শেরিং নগরীটির বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নগরীর উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে আইনের শাসন নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত জিএমসি ভুটানের ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এ অঞ্চলের নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় স্বতন্ত্র ক্ষমতা রয়েছে।
নগরীটির আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইনের আদলে। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের আইনব্যবস্থা এবং আবুধাবি গ্লোবাল মার্কেটের বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে।
গভর্নর জানান, যুক্তরাজ্যের লর্ড অ্যান্ড্রু ফল্কসকে জিএমসির প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি দেশের সাতজন বিশিষ্ট বিচারককে বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। সেখানে নিজস্ব সালিসি কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
লোটে শেরিং বলেন, জিএমসিতে বিনিয়োগ করতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি প্রতিষ্ঠান সেখানে সরাসরি কার্যালয় স্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদেশি এবং বাকি ৭০ শতাংশ ভুটানের প্রতিষ্ঠান।
দর্শনার্থীদের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি
বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম সামাল দিতে যানবাহন চলাচল, নিরাপত্তা, আবাসন ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দ্য ভুটানিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠান চলাকালে গেলেফুতে প্রায় ৪০ হাজার ৩০০ যানবাহন প্রবেশ করতে পারে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে রয়্যাল ভুটান পুলিশ যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।
দর্শনার্থীদের থাকার জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষের থাকার উপযোগী একটি ক্যাম্পিং এলাকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবারের দোকান ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধাও রাখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য এক লাখের বেশি মানুষের উপস্থিতি বিবেচনায় ভুটান টেলিকম ও তাশিসেল তাদের নেটওয়ার্ক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ফোরজি ও ফাইভজি নেটওয়ার্ক এবং উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভুটানের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামনে আনার একটি বড় আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে এ অনুষ্ঠানকে। একই সঙ্গে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।