ভুটানের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) শীর্ষ নেতা শেরিং তোবগে। ৫৮ বছর বয়সী শেরিং তোবগে একাধারে রাজনীতিবিদ, পরিবেশ আন্দোলন নেতা এবং আইনজীবী। যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি হার্ভার্ড থেকে লোকপ্রশাসনে মাস্টার্স করেছেন তিনি। পিডিপি আগের সংসদে বিরোধী দল হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিল।
ভুটান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস জানিয়েছে, প্রায় পাঁচ লাখ ভোটার জাতীয় পরিষদের ৪৭ জন সদস্য নির্বাচন করতে ভোট দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০টিতে জিতেছে পিডিপি এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দ্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) পায় ১৭টি আসন। তারাই হবে পার্লামেন্টে বিরোধী দল। নতুন সংসদে সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এ যাবৎকালে দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী সদস্য এরা।
নতুন ৪৭ জন এমপির মধ্যে একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী, ২৬ জন মাস্টার্স এবং বাকিরা স্নাতক। বয়সের ক্ষেত্রে একজন ২০’র, ১৪ জন ৩০’র, ১৩ জন ৫০’র ও দুইজন ৬০’ বছরের কোটায়। ২০০৮ সালে ঐতিহ্যবাহী রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় সরকারে রূপান্তরিত হওয়ার পর এটি ছিল ভুটানের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচন।
ভৌগলিক দিক দিয়ে ভুটানের অবস্থান বিশ্বের দুটি সর্বাধিক জনবহুল এবং এশিয়ার দুই প্রভাবশালী শত্রুভাবাপন্ন দেশ চীন এবং ভারতের মাঝখানে। ভারত আগে থেকেই ভুটানকে ‘বাফার স্টেট’ (প্রভাবশালী দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে দুর্বল রাষ্ট্র) বিবেচনা করে আসছে।
কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলগুলোর ভবিষৎ বিবেচনায় রেখে এবারের নির্বাচন, ভোটগ্রহণ এবং পরবর্তী ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়ার ওপর গভীর আগ্রহ ছিল ভারত ও চীনের। রাজনৈতিক সূত্রের ‘বার্তা’ ছিল, মালদ্বীপ জয়ের পর এবার ভুটানের ভোটেও নাক গলাবে চীন। ভারতের বন্ধুদের হারানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু হিমালয় ঘেরা দেশটির জাতীয় আইনসভা ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’র ভোটে ‘ভারতের বন্ধু’ বলে পরিচিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের দল পিডিপি (পিডিপি) বিপুল ভাবে জয়ী হল। শেরিং তোবগে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়া ভুটানের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হিসেবে চিহ্নিত করছে ভারত ৷
বিশ্লেষকরা শেরিং তোবগের রাজনৈতিক যাত্রাটি ভুটান ও প্রতিবেশী ভারতের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলে ধারণা করছেন। ২০১৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তিনি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে সহযোগিতা জোরদার করতে ভারতের দিকে বেশি ঝুঁকেছিলেন। শেরিং তোবগে তার বিজয় ভাষণেও ভুটানের জনগণের সমর্থন এবং তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তিনি ভুটানের সার্বভৌমত্ব এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও সম্মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ভারত এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছেন। তবে তার এই ভারত সম্পৃক্ততা চীনের সঙ্গে চলমান সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনা পর্ব যেটুকু এগিয়েছিল তা আবার মুখ থুবড়ে পড়ে কিনা সে বিষয়েও ভাবতে হবে।
নির্বাচনী ইশতেহারে তোবগের দল ভুটানের ‘অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ’ এবং ‘ব্যাপক দেশত্যাগ’ বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। গত নির্বাচনের পর থেকে ভুটানের রেকর্ডসংখ্যক তরুণ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। দেশটিতে প্রতি আটজনের একজন খাদ্য চাহিদা মেটাতে সংগ্রাম করছেন। শেরিং তোবগে এ দুটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভারত-ভুটানের মজবুত সম্পর্কের ভিত্তি ১৯৪৯ সালের ইন্দো-ভুটান মৈত্রী চুক্তি। ভুটানের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা সবসময়ই ভারতের জন্য একটি প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। ভারত ভুটানকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে আসছে। শুধুমাত্র ভুটানের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে নয় বরং পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্যের উৎস এবং বাজার হিসেবেও ভারত ভুটানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক হার্শ ভি পন্ত বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভুটান হচ্ছে ‘শেষ ধাপের কয়েকটি বাধার একটি’। ভারত এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব আর বাড়তে দিতে চায় না। তারা এ অঞ্চলকে নিজের প্রভাব বলয়ের অংশ মনে করে থাকে। যে কারণে বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বেইজিংয়ের ঋণ ও নানা চুক্তির বিষয়ে নয়াদিল্লি বেশ সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
নয়াদিল্লি বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং দুই দেশের তিন হাজার ৫০০ কিলোমিটার (দুই হাজার ১৭৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে সতর্ক। এ সীমান্তের কিছু অংশ ইতিমধ্যে সংঘাতপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০১৭ সালে চীন-ভারত-ভুটান সীমান্তবর্তী বিতর্কিত দোকলাম মালভূমির দিকে চীনা সৈন্যরা অগ্রসর হলে ভারত ও চীনের মধ্যে দুমাসেরও বেশি সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। এই মালভূমি দক্ষিণে ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের দিকে চলে গেছে। দুই পাশে বাংলাদেশ ও নেপাল। মাঝখান দিয়ে বিপজ্জনকভাবে সরু লম্বালম্বি ভূখণ্ড ‘চিকেন নেক’ দিয়ে ভারতের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যোগাযোগ। ১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে এ অঞ্চলে প্রায় এক মাস যুদ্ধ হয়েছিল। সে সময়ে হিমালয়ে চীন ও ভারতের সীমান্ত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল ভুটানও। ১৯৬২ সালে ইন্দো-চীন যুদ্ধের পর থেকেই দোকালাম মালভূমি ভুটানের নিরাপত্তার একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কারণ চীন-ভুটান উভয়ই এই মালভূমি ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ভুটানের দাবিকে শক্তভাবে সমর্থন দিচ্ছে ভারত।
চাথাম হাউস বলছে, ভুটানের উত্তরাঞ্চলে সীমান্ত চিহ্নিত করে চুক্তি হয়ে গেলে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের দিকে চীনের দৃষ্টি যেতে পারে, যেখানে দোকলাম মালভূমিসহ কিছু এলাকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অধ্যাপক হার্শ ভি পন্ত বলছেন, চীনের তুলনায় খুবই ছোট ভুটানের জন্য এমন একটি চুক্তি অনেক বড় ব্যাপার। তিনি আরও বলেন, ‘এখনই যদি ভুটান সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা না করে, ভবিষ্যতে তারা আরও বড় বেকায়দায় পড়ে যেতে পারে।’
এসব দিক বিবেচনায় রেখে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে। তবে এসব বিষয় তোবগে বিবেচনায় রেখেছেন। বিজয়ী ভাষণে তিনি বলেছেন চীনের সাথে ভুটানের ‘ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে, তবে ভারতের মতো গভীর নয়। তিনি বলেন, আমাদের ৪৭০ কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ে এখনও বিরোধ রয়েছে চীনের সঙ্গে যা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। আমরা সীমান্ত নিয়ে আলোচনা করছি এবং আমাদের সীমান্ত চূড়ান্ত করতে হবে।
মালদ্বীপের মেয়র নির্বাচন কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
ইরান-পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে
নিজেদের সম্পদে কর আরোপ চান কোটিপতিরা
শক্তিশালী মুদ্রার তালিকায় শীর্ষস্থান হারাল ডলার!
ভারত বাদ দিয়ে তুরস্কের ড্রোন কিনছে মালদ্বীপ