ভেনিসে কয়েক ঘণ্টা

নাম ফ্রেঁসিওরোসা। ইতালির বিখ্যাত একটি ট্রেন। উচ্চারণ করতে গেলে ফ্রান্স ফ্রান্স অ্যারোমা বা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বাংলায় তরজমা করলে অর্থ দাঁড়ায় লাল তীর। তীরের মতো তীব্র বেগে ধাবমান বলে এমন নাম দেওয়া হয়েছে ট্রেনের। সেই ট্রেনে চেপে যাচ্ছি ভেনিস। মিলান সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে সকালেই যাত্রা শুরু।

আমরা বলি ভেনিস। ইতালিতে বলে ভেনিজিয়া। এখানকার শেষ স্টেশন ভেনিজিয়া সেন্ট লুসিয়া। ট্রেনে যাচ্ছি, ইন্টাররেল সার্ভিসে। এই ইন্টাররেল পাস দিয়ে ইউরোপের ৩৩টা দেশে ঘোরা যাবে। বিভিন্ন মেয়াদের পাস রয়েছে। অনলাইনে পে করে পাস নিতে পারেন। আমি দশ দিনের পাস নিয়েছি। চারশ ডলার। তবে কোথাও কোথাও যেতে আসন রিজার্ভেশনের জন্য অতিরিক্ত ডলার গুনতে হয়। এই সময়ের মধ্যে ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করা যাবে ট্রেনে। ফিরতি টিকিটও সে জন্য করা আছে। সাত ঘণ্টা অবস্থানের টার্গেট নিয়ে এসেছি এখানে।

তীর বেগে চলতে পারা ট্রেনের গতি যে খুব বেশি তা বলা যাবে না। তবে কত গতিতে চলে তা ট্রেনে বসেই আপনি দেখতে পাবেন। তিনশ কিলোমিটার বেগে চলতে পারলেও সর্বোচ্চ ২৩০ কিমি বেগে চলছে ট্রেন। মোটামুটি ফাঁকা ট্রেন। চার জনের মুখোমুখি সিটে বসে আছি দুজন। আমার সহযাত্রী ষাটোর্ধ্ব বয়সী ইতালির নাগরিক। তিনি নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্পোরাল। ইংরেজি তেমন বলতে পারেন না। ভাঙা ভাঙা ইংরেজি মোবাইলে লিখে আমার সঙ্গে কথা হলো। তিনি একজন স্নাইপার, কমান্ডো। কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি মিশনে অংশ নিয়েছেন। আমার সশস্ত্র বাহিনীর পরিচয় পেয়ে তিনি যেন তার সৈনিক জীবন ফিরে পেলেন। স্মৃতির ঢেউ আছড়ে পড়ছে তার অন্তরে কিন্তু বলতে পারছেন না পুরোটা। বলতে না পারলেও ফেলে আসা রোমাঞ্চকর সৈনিক জীবনের সোনালি স্মৃতির আভায় ঝকমক করছিল তার মুখাবয়ব।

মিলান থেকে বেশ কিছু সময় পর প্রথম স্টেশনে এসে ট্রেন থামল। ব্রেসিয়া স্টেশন। আমাদের টঙ্গী রেল স্টেশনের মতো। মানুষ তো হাতেগোনা জনাকয়েক। কয়েকজন যাত্রী নেমে গেলেন। উঠলেন তার চেয়ে কম। কোনো শব্দ নেই, হকার  নেই, নেশাখোর নেই। দুটো সুন্দরী ট্রেন শুধু দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রা শুরুর অপেক্ষায়। ব্রেসিয়া স্টেশন থেকেই দেখা যাচ্ছিল উঁচু পাহাড়। স্টেশন পাড়ি দিতেই নজরে এলো পাহাড়। আলপস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এই শহর। ভুট্টা আর আলুর চাষ হচ্ছে। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হয়েছে চাষের জন্য। কোথাও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজ ফসল। আঙুর চাষের জন্যও বিখ্যাত এই এলাকা। আমার সহযাত্রী জানালেন এগুলো মদ তৈরির কাঁচামাল।

ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমাদের ট্রেন চলে এলো ভেনিসে। ভেনিসে প্রবেশের আগেই ট্রেন পাড়ি দিল বিশাল লেক। দুপাশে নীল জলরাশি। মাঝ দিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। মানুষ ট্রেনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ধারণ করছে অদ্ভুত নীলাভ জলের নৈসর্গিক দৃশ্য।  সাজানো গোছানো স্টেশন। সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন রঙের ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। অনেক মানুষের আনাগোনা। স্টেশনে নামলাম। স্টেশন থেকে কদম ফেললেই চোখে পড়বে বড় খাল বা গ্রান্ড ক্যানেল। নানান পদের নৌকা চলছে। কোনোটি ইঞ্জিনবাহিত, কোনোটি আবার বৈঠাচালিত। আছে স্পিডবোট, লঞ্চ, ফেরোভিয়া বা ফেরি। ছলাৎ ছলাৎ করে পানি উপচে পড়ছে শান বাঁধানো পাড়ে। খালের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট। মানুষ বসে বসে দেখছে ঢেউ আর নৌকার দুলুনি। বড় বড় পাখি বসে আছে মানুষের একেবারে কাছে, খাবারের আশায়।

হালকা শীত। গ্রান্ড ক্যানেলের ওপর উঁচু ব্রিজ। এ রকম ছোট-বড় প্রায় ৪৭২টি ব্রিজ দিয়ে সংযুক্ত ভেনিসের এই অংশ। নিচ দিয়ে বোট আর ওপর দিয়ে মানুষের যাতায়াত। ব্রিজ পেরিয়ে অপর পাড়ে গেলাম। দুটো নদীর মোহনা। পো আর পিয়াভে। ১২৬টি ছোট দ্বীপের সমাহার এখানে। এক দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরের পথে পথে হাঁটছি।

  পুরনো ইটগাঁথা দুই তিন তলা বাড়ি। আয়তাকার-বর্গাকার পাথর বিছানো রাস্তা। এক একটা গলি গিয়ে মিলেছে খালে। সব পথ যেন মিশে গেছে খালে।  ঘরবাড়ি আছে কিন্তু মনে হচ্ছে মানুষ নেই। ভেনিসের পথে পথে উদাসীনভাবে একাকী সারা দিন পথ চলতে চলতে একটা কাব্যিক আনন্দ নেমে আসছিল। পথে পথে ছোট ছোট রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, গিফ্ট শপ, মদের দোকান। মাঝে দু-একটা আবাসিক হোটেল।

মানুষের হাঁটার শব্দ আর মাঝে মাঝে লাগেজ-ট্রলির চাকার শব্দ। আর সরু সরু খালে আছড়ে পড়া জলতরঙ্গের শব্দ। এই মিলে ভেনিসের পথ।

বরিশালে ভাসমান পেয়ারা হাটের কথা মনে ভাসছে। তৃতীয় বিশ্ব আর উন্নত বিশ্বের আয়োজনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বরিশালের ক্যানেল অনেক বেশি বড়। প্রাকৃতিক নালায় সবুজের আচ্ছাদন। আর এখানে বড় খাল থেকে ঢুকে পড়েছে শত শত খাল। মাঝে অসংখ্য দরদালান। পরিকল্পিত এক সুনসান নীরব শহর এই ভেনিস। বিশ্বের পর্যটকদের এক আকর্ষণীয় স্থান। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় ক্লান্তি এসে ভর করল। বিশ্রাম নিলাম গির্জার সিঁড়িতে। ক্ষুধা মাথাচাড়া দিচ্ছে। বেশ কিছু সংখ্যক বাংলাদেশির সাক্ষাৎ পেলাম যারা এখানে ছোট ছোট দোকান সাজিয়ে ব্যবসা করছেন। স্টেশন সংলগ্ন পাড়ে তখন পর্যটকদের ভিড়। তাদের কাছে খবর নিয়ে এক রেস্তোরাঁয় গিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। খাবারের নাম পানিনু। খেয়েদেয়ে আরও কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে পড়ন্ত বিকেলে ফিরতি ট্রেনে চেপে বসলাম মিলানের উদ্দেশ্যে।