শাড়ির বাইরে জামদানি

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৮ এএম

শাড়ির গন্ডি পেরিয়ে জামদানির কাপড় বুনন করছেন তাঁতিরা। আর সেই কাপড় দিয়ে ডিজাইনারা তৈরি করছেন লং কটি, শার্ট কিংবা কুর্তার মতো পোশাক। ঐতিহ্যে আর আধুনিক পোশাকের কাটছাঁট মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিন্নধর্মী ফ্যাশন। হালকা শীতের পোশাকে জামদানির এমন বহুমাত্রিক ব্যবহার নিয়ে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

বাংলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের কথা উঠলেই প্রথমে মনে আসে জামদানির নাম। সূক্ষ্ম বুনন, নান্দনিক নকশা আর আভিজাত্যের কারণে জামদানি বরাবরই ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। এক সময় জামদানি বলতে শাড়িকেই বোঝানো হতো। উৎসব অনুষ্ঠানে জামদানি শাড়িই ছিল ভরসা। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে এর ব্যবহার। শাড়ির পাশাপাশি জামদানি বুননের কাপড়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক পোশাক। বিশেষ করে হালকা শীতের ফ্যাশনে লং কটি, শার্ট, কুর্তা, টপস কিংবা জ্যাকেটের মতো পোশাকে জামদানির ব্যবহার বেশ নজর কাড়ছে।

ঐতিহ্যবাহী ফেব্রিকসকে শুধু বিশেষ আয়োজনের পোশাকে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিদিনের ফ্যাশনে নিয়ে আসার এই প্রবণতা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন দেশীয় বুননশিল্পের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মও জামদানিকে দেখছে ভিন্ন চোখে। শাড়ির চিরচেনা সৌন্দর্য ছাড়িয়ে জামদানি এখন হয়ে উঠছে আধুনিক, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও বহুমাত্রিক ফ্যাশনের অনুষঙ্গ।

লং কটিতে চিরচেনা সাজ

হালকা শীতের পোশাক হিসেবে লং কটির জনপ্রিয়তা বেশ পুরনো। বিশেষ করে যারা পোশাকে একটু ভিন্নতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য জামদানি বুননের লং কটি হতে পারে আকর্ষণীয় সংযোজন। সাধারণ কটির তুলনায় জামদানি কাপড়ের কটিতে থাকে আলাদা নান্দনিকতা। কাপড়ের বুনন ও নকশাই পোশাকটিকে করে তোলে বিশেষ। প্যান্ট, টপস টি-শার্ট কিংবা সিঙ্গেল কামিজ-সালোয়ারের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায় লং কটি। লং কটির ক্ষেত্রে সাধারণত সোজা কাট, এ-লাইন, সামান্য ঘের কিংবা সামনের দিকে খোলা ডিজাইন দেখা যায়। কোনো কোনোটিতে রাখা হচ্ছে বড় কলার, আবার কোনো কটিতে থাকছে বোতামের ব্যবহার। হাতার ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ফুলহাতা, থ্রি-কোয়ার্টার কিংবা হাতাবিহীনÑ সব ধরনের নকশাতেই জামদানি কটি মানিয়ে যায়। এ ধরনের কটি একরঙা কুর্তা, সলিড টপস কিংবা সাধারণ শার্টের ওপর পরা যায়। নিচে পালাজ্জো, স্ট্রেট প্যান্ট বা জিনসের সঙ্গে পরলে তৈরি হয় ক্যাজুয়াল অথচ রুচিশীল লুক। অফিস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা ছোটখাটো অনুষ্ঠানে এই পোশাক আলাদা লুক তৈরি করবে।

শার্টে নতুন মাত্রা

জামদানি বুননের শার্ট ফ্যাশনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। প্রচলিত সুতি কিংবা লিনেন শার্টের বাইরে যারা একটু ব্যতিক্রমী পোশাক খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে ভালো পছন্দ। নারী ও পুরুষ উভয়ের পোশাকেই জামদানি শার্টের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নারীদের শার্টে থাকছে ওভারসাইজড কাট, বক্সি শেপ, লংলাইন কিংবা কোমর পর্যন্ত ছোট দৈর্ঘ্যরে নকশা। কোনো শার্টে কলার ও কাফে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিন্ন রঙের কাপড়। আবার কোথাও পুরো শার্টজুড়েই থাকছে জামদানির বুনন। বোতাম, পকেট ও কলারের নকশায়ও আনা হচ্ছে বৈচিত্র্য। পুরুষদের জন্যও জামদানি শার্ট হতে পারে আকর্ষণীয় বিকল্প। ক্যাজুয়াল আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা উৎসবের আয়োজনে সাদামাটা ট্রাউজার বা ডেনিমের সঙ্গে এমন শার্ট মানিয়ে যায়। বিশেষ করে হালকা রঙের জামদানি শার্টের সঙ্গে গাঢ় রঙের প্যান্ট পোশাকে আনে পরিমিত আভিজাত্য।

কুর্তায় নান্দনিকতা

দেশীয় পোশাকের মধ্যে কুর্তার জনপ্রিয়তা সব সময়ই রয়েছে। আর জামদানি বুননের কুর্তা সেই পরিচিত পোশাকে যোগ করছে নতুন সৌন্দর্য। সাধারণ কুর্তার তুলনায় জামদানি কুর্তার বিশেষত্ব হলো এর বুনন ও নকশা। খুব বেশি অলংকরণ ছাড়াই কাপড়ের নিজস্ব সৌন্দর্য পোশাকটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

কুর্তার ক্ষেত্রে স্ট্রেট কাট, এ-লাইন, ফ্লেয়ারড কিংবা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা নকশা দেখা যায়। গলা ও হাতার ডিজাইনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। গোল গলা, ভি-নেক, বোট নেক কিংবা কলার দেওয়া কুর্তা সব ধরনের নকশাতেই জামদানি বুনন মানিয়ে যায়। কোনো কোনো পোশাকে গলার অংশে আলাদা এমব্রয়ডারি, পাড় কিংবা কনট্রাস্ট কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনে দুইপাশে রয়েছে পকেট। জামদানি কুর্তার সঙ্গে পালাজ্জো, স্ট্রেট প্যান্ট কিংবা চুড়িদার পরা যায়। আবার একটু আধুনিক লুক চাইলে ডেনিমের সঙ্গেও মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। অফিস কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের পাশাপাশি পারিবারিক অনুষ্ঠানেও এমন পোশাক উপযোগী।

নকশায় পুরনো-নতুনের মেলবন্ধন

জামদানির সৌন্দর্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে এর নকশা। ঐতিহ্যবাহী জামদানিতে জ্যামিতিক নকশা, ফুল, লতা-পাতা, কলকা, জাল কিংবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক মোটিফের ব্যবহার দেখা যায়। এসব নকশাই নতুন পোশাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কখনো পুরো কাপড়জুড়ে ছোট ছোট ফুলের নকশা, কখনো আবার পোশাকের নির্দিষ্ট অংশে মোটিফের ব্যবহার। লং কটির সামনের অংশে বড় মোটিফ, শার্টের পকেট বা কলারে জামদানি নকশা কিংবা কুর্তার গলা ও হাতায় বুননের বিশেষত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। কোথাও আবার কাপড়ের একাংশে ঘন নকশা রেখে বাকি অংশ রাখা হচ্ছে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা। এতে পোশাকের নকশায় তৈরি হচ্ছে ভারসাম্য। ঐতিহ্যবাহী মোটিফের পাশাপাশি জ্যামিতিক নকশা, মিনিমাল প্যাটার্ন ও সমসাময়িক মোটিফের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। ফলে যারা অতিরিক্ত নকশার পোশাক পছন্দ করেন না, তারাও নিজেদের রুচি অনুযায়ী জামদানি পোশাক বেছে নিতে পারছেন।

রঙের খেলায় বৈচিত্র্য

জামদানি পোশাকের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক রঙের ব্যবহার। ঐতিহ্যগতভাবে সাদা, অফহোয়াইট, লাল, কালো, নীল কিংবা সবুজের মতো রঙ জামদানিতে বেশ পরিচিত। তবে আধুনিক পোশাকে যুক্ত হচ্ছে আরও নানা রঙ। হালকা শীতের জন্য প্যাস্টেল শেডের পোশাক বেশ মানানসই। পাউডার ব্লু, মিন্ট গ্রিন, পিচ, ল্যাভেন্ডার, বেবি পিংক কিংবা ক্রিম রঙের জামদানি কটি ও কুর্তা দেখতে স্নিগ্ধ লাগে। যারা একটু গাঢ় রং পছন্দ করেন, তারা বেছে নিতে পারেন মেরুন, নেভি ব্লু, বোতল সবুজ, কালো কিংবা বারগান্ডি। রঙের পাশাপাশি কনট্রাস্ট ব্যবহারের প্রবণতাও রয়েছে। যেমনÑ সাদা জামদানি কাপড়ে লাল বা নীল নকশা, কালো জমিনে সোনালি আভা কিংবা অফহোয়াইটের সঙ্গে সবুজের সমন্বয়। আবার একই পোশাকে দুই বা তিনটি রঙের বুননও তৈরি করতে পারে ভিন্নধর্মী সৌন্দর্য।

হালকা শীতে কেন উপযোগী

হালকা শীতের সময়ে পোশাক নির্বাচনে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্টাইলÑ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ভারী শীতের পোশাক পরার প্রয়োজন হয় না, আবার গরমের পোশাকেও সব সময় স্বস্তি মেলে না। এই জায়গায় জামদানি বুননের কটি, শার্ট কিংবা কুর্তা হতে পারে উপযোগী। তবে পোশাকের আরাম অনেকটাই নির্ভর করে কাপড়ের উপাদান, বুননের ঘনত্ব ও আস্তরণের ওপর। জামদানি বুননের পোশাকের ক্ষেত্রে সুতি বা সুতি-প্রধান কাপড় বেছে নিলে আরাম পাওয়া যায়। হালকা কটি বা কুর্তার সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ভেতরে পাতলা সুতি টপস বা শার্ট পরা যায়। এতে আবহাওয়ার সঙ্গে পোশাকের সমন্বয় করা সহজ হয়। জামদানি পোশাকের একটি বড় সুবিধা হলো, একই পোশাক বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়। যেমনÑ একটি লং কটি কখনো কুর্তার ওপর, কখনো সাধারণ টপসের সঙ্গে পরা সম্ভব। ফলে পোশাকের ব্যবহারও বাড়ে।

কাদের জন্য কেমন পোশাক

জামদানি বুননের আধুনিক পোশাকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বয়স কিংবা পেশার নির্দিষ্ট গ-িতে আটকে নেই এর ব্যবহার। তরুণীদের জন্য ওভারসাইজড জামদানি শার্ট, ছোট কটি কিংবা বক্সি কাটের টপস হতে পারে দারুণ পছন্দ। জিনস বা ওয়াইড লেগ প্যান্টের সঙ্গে এসব পোশাক পরলে তৈরি হয় আধুনিক ক্যাজুয়াল লুক।

অন্যদিকে যারা পরিপাটি ও মার্জিত পোশাক পছন্দ করেন, তাদের জন্য স্ট্রেট কাটের কুর্তা কিংবা লং কটি ভালো বিকল্প। কর্মজীবী নারীরা অফিসে একরঙা পোশাকের ওপর জামদানি কটি পরতে পারেন। এতে খুব বেশি সাজসজ্জা ছাড়াই পোশাকে আভিজাত্য ফুটে ওঠে। মধ্যবয়সী নারীদের জন্যও রয়েছে বেশ কিছু বিকল্প। তারা চাইলে হালকা নকশার লং কুর্তা কিংবা পরিমিত কাটের কটি বেছে নিতে পারেন।

কোথায় পাবেন ব্যতিক্রমী পোশাক

জামদানি বুননের পোশাক খুঁজতে গেলে প্রথমেই নজর দেওয়া যেতে পারে দেশীয় ফ্যাশন হাউজ ও বুটিকগুলোতে। আড়ং, দেশাল, কে ক্র্যাফট, বেনেবৌ, রঙ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সংগ্রহে জামদানি ও জামদানি-অনুপ্রাণিত পোশাকের খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। যারা একটু স্বতন্ত্র ডিজাইন চান, তারা জামদানি তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় সংগ্রহ করে পছন্দমতো পোশাক তৈরি করিয়ে নিতে পারেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও আশপাশের জামদানি উৎপাদন এলাকার তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। এতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পোশাকের কাট, দৈর্ঘ্য, হাতা ও নকশা নির্ধারণ করা সম্ভব।

অনলাইনেও এখন দেশীয় পোশাকের বেশ কিছু দোকান ও ফ্যাশন পেজ রয়েছে।

সাজে থাকুক পরিমিতি

জামদানি বুননের পোশাক নিজেই বেশ আকর্ষণীয়। তাই এর সঙ্গে অতিরিক্ত অনুষঙ্গ যোগ না করলেও চলে। লং কটির সঙ্গে ছোট ঝুমকা, সাধারণ চুড়ি কিংবা দেশীয় গয়না মানিয়ে যায়। শার্টের সঙ্গে ছোট কানের দুল, ঘড়ি ও স্নিকার্স হতে পারে সুন্দর সমন্বয়। কুর্তার সঙ্গে অক্সিডাইজড গয়না, ছোট ব্যাগ কিংবা ফ্ল্যাট স্যান্ডেলেও তৈরি হবে পরিপাটি সাজ।

মেকআপের ক্ষেত্রেও খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন নেই। হালকা বেস, কাজল, ন্যাচারাল লিপস্টিক আর গুছিয়ে বাঁধা চুলেই ফুটে উঠতে পারে পোশাকের সৌন্দর্য। চাইলে চুল খোলা রেখেও তৈরি করা যায় সহজ ও স্বাভাবিক লুক।

জামদানি এখন আর শুধু উৎসবের আলমারিতে তুলে রাখার পোশাক নয়। নতুন আঙ্গিকে ব্যবহার করেই তৈরি হতে পারে নিজস্ব ফ্যাশন পরিচয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত