ইউরোপিয়ান ফুটবলে ইস্তাম্বুল বললেই চোখে ভাসে অবিশ্বাস্য সব প্রত্যাবর্তনের চিত্র। তবে এবার আর কোনো ইংলিশ পরাশক্তির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়, তুর্কি ক্লাব ফেনারবাচের বীরত্বে নিজেদের রূপকথা নিজেরাই লিখল অলরেডদের সাবেক নায়ক ডার্ক কুয়েতের শিষ্যরা। চ্যাম্পিয়নস লিগে দীর্ঘ ১৮ বছরের জয়ের খরা কাটিয়ে ঘরের মাঠে লিভারপুলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল ফেনারবাচে।
ম্যাচের দুই অর্ধে দু-দুবার পিছিয়ে পড়েও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় মনে রাখার মতো জয় ছিনিয়ে আনল তুর্কি জায়ান্টরা। ২০০৮ সালের এপ্রিলের পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মূলপর্বে এটাই তাদের প্রথম জয়; কাকতালীয়ভাবে সেবারও তারা চেলসির মতো অন্য এক ইংলিশ ক্লাবকেই পরাজিত করেছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই লিভারপুল বল দখলে আধিপত্য দেখালেও ইস্তাম্বুলের কানফাটা করতালির জবাবে লড়াই চালিয়ে যায় ফেনারবাচে। ২৫তম মিনিটে রিউ এনগুমোহার দুর্দান্ত একটি আক্রমণ থেকে সুযোগ নিয়ে তরুণ তুর্কি মিডফিল্ডার ট্রে নিওনির নেওয়া নিচু ভলি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের গায়ে সামান্য দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। জ্যেষ্ঠ ক্যারিয়ারের প্রথম গোল নিয়ে নিওনি অলরেডদের এগিয়ে নেওয়ার উদযাপনে মাতলেও সেই উল্লাস স্থায়ী হয়নি চার মিনিটের বেশি। ২৯তম মিনিটে মেসন গ্রিনউডের নেওয়া অনেক দূর থেকে বাঁকানো ফ্রি-কিক লিভারপুলের ডিফেন্ডার জেরেমি জাকের পেটে লেগে ভুল পথে ধাবিত হয়ে আলিসনকে পরাস্ত করে ১-১ সমতা আনে।
দ্বিতীয়ার্ধের চিত্রটাও যেন প্রথমার্ধেরই হুবহু প্রতিলিপি। ৬৯তম মিনিটে বদলি নামা আলেকজান্ডার ইসাক, কোডি গাকপোর সহায়তায় চোখ ধাঁধানো হেডে আবারও লিভারপুলকে এগিয়ে নেন। তবে চার মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে এনগোলো কান্তের বাড়ানো ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে গাকপো নিজেই গোলরক্ষক আলিসনের হাত থেকে বল দূরে ঠেলে দেন। সেই সুযোগে একেবারে কাছ থেকে আলতো ট্যাপ-ইনে স্বাগতিকদের সমতায় ফেরান আর্চি ব্রাউন।
এর ঠিক ছয় মিনিট পর ম্যাচের সবচেয়ে বড় নাটকীয় মুহূর্তটি আসে। ব্রাউনের বাড়ানো বাতাসে ভেসে আসা দীর্ঘ বল তিন ডিফেন্ডারকে শারীরিক শক্তিতে পরাস্ত করে হেডে আলিসনের বার কুপোকাত করেন ভেদাত মুরিচ। সেখানেই ৩-২ ব্যবধানের সেই না দেখা জয়টা পেয়ে যায় স্বাগতিকরা।
মাঠের বাইরে টানা দু-দুবার এগিয়ে গিয়েও সহজ সেট-পিস থেকে এমন বাজেভাবে তিনটি গোল হজম করায় ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি লিভারপুলের কোচ আন্দোনি ইরাওলা। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এগুলো একদমই সস্তা গোল, বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা জানতাম ফেনারবাচের বড় শক্তি তাদের সেট-পিস। প্রতিপক্ষের মাঠে দুইবার এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচটা জেতার আত্মবিশ্বাস আমাদের ছিল, কিন্তু নিজেদের ভুলেই আমাদের মাশুল গুনতে হলো।’
তুর্কি সমর্থকদের কানফাটা চিৎকারে মাঠে যোগাযোগ করাও অসম্ভব ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘স্টেডিয়ামে এত আওয়াজ ছিল যে আমার নির্দেশ পৌঁছে দেওয়াই কঠিন ছিল, মাঠের ভেতরে আলিসন ও গাকপোর মধ্যেও সম্ভবত যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।’
অন্যদিকে ফেনারবাচের ডাগআউটে থাকা লিভারপুলেরই একসময়ের প্রিয়মুখ ডার্ক কুয়েতের জন্য রাতটি ছিল অলৌকিক আনন্দের। ইস্তাম্বুলে ফের এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ম্যাচ শেষে আবেগঘন কণ্ঠে কুয়েত বলেন, ‘আমরা কোনো ভাগ্যের জোরে জিতিনি, আমরা পুরোপুরি জয়টা পাওয়ার যোগ্য ছিলাম। লিভারপুলে খেলার সময় আমি শিখেছিলাম কীভাবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে এক হয়ে থাকতে হয়। ১৮ বছর পর আমরা কোনো ইংলিশ পরাশক্তিকে হারালাম, আর ফুটবল ক্যারিয়ারে লিভারপুলে আমার জার্সির নম্বরও ছিল ১৮; ব্যক্তিগতভাবে এটি আমার কাছে এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি।’
এছাড়া দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেওয়া বদলি ফরোয়ার্ড ভেদাত মুরিচ নিজের আবেগের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘২০০৮ সালে যখন ফেনারবাচে শেষবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসিকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল, তখন আমি কসোভোতে ছোট শিশু হিসেবে বন্ধুদের সাথে বসে ম্যাচটা দেখেছিলাম। এর দীর্ঘ ১৮ বছর পর একই মঞ্চে ক্লাবের জয়সূচক গোল করতে পেরে আমি গর্বিত ও আনন্দিত। কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া আমাদের ক্লাবের জন্য এই জয়টি নিশ্চিতভাবেই বড় এক পরিবর্তনের সূচনা হবে।’