বোরো মৌসুমে অতিরিক্ত চাল কেনার কারণে সরকারের গুদাম টইটম্বুর। বস্তার সংকটও তীব্র। ভিয়েতনাম থেকেও এক লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমন মৌসুমের ধান-চাল কেনার লক্ষ্য নির্ধারণে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি (এফপিএমসি) সভা করতে যাচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরের সূত্রগুলো বলছে, ব্যবসায়ীদের চাপ থাকলেও এবার সীমিত পরিমাণে চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে কৃষক যাতে লাভবান হয়, সেদিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৮ নভেম্বর সকালে এফপিএমসির সভা হবে। খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের সভাপতিত্বে এতে ৯ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা। সভায় ধান ও চাল কেনার মূল্য ও পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমন মৌসুমে সরকার সাত লাখ টন ধান ও চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে সেবার সরকার কৃষকদের সীমিত সুযোগ দিয়েছিল। ব্যাপক হারে চাল কিনে মিলারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। সেবার ৫০ হাজার টন ধান কেনার ঘোষণা দিয়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন ধান এবং ৯ লাখ টন চাল কেনা হয়েছিল মিলারদের কাছ থেকে। মিলারদের আগ্রহ ছিল চালের দামে। প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা ও আতপ চাল কেনা হয় ৪৯ টাকা কেজি দরে। ধানের দাম ছিল ৩৪ টাকা কেজি। ধান ও চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণেও খাদ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, গত আমন ও বোরো মৌসুমে মিলমালিকরা সরকারের কাছে ঢালাওভাবে চাল বিক্রির সুযোগ পেয়েছিলেন। কাউকে কাউকে সরকারি দামে ব্যাপক লাভও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কৃষকের ধানের দামে লাভ ছিল খুবই সীমিত। এবারও মিলমালিকরা খাদ্য বিভাগে ব্যাপক চাপ তৈরি করছেন, যাতে সরকার বেশি পরিমাণে চাল কেনার সুযোগ তৈরি করে।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি উল্টো। খাদ্য বিভাগ বলছে, এবার চাল নয়, ধান কেনায় বাড়তি গুরুত্ব থাকবে। কারণ বস্তার ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারি গুদামে বাড়তি চাল রাখার জায়গা খুবই সীমিত। আবার বিদেশ থেকেও চাল আমদানি চলছে। এ প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত চাল না কেনাই উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গত ৩ নভেম্বরের তথ্যানুযায়ী, সরকারের গুদামে ২১ লাখ ২২ হাজার ২৮৫ টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। সরকারি গুদামের কার্যকরী মজুদন্ডসক্ষমতা ২২ লাখ ৯৩ হাজার টন। ফলে খাদ্য বিভাগ চাইছে, নানা কর্মসূচিতে খাদ্যশস্য বিতরণ করে দ্রুত গুদামে জায়গা তৈরি করতে। এ জন্য নানা পরিকল্পনা তৈরির কাজও চলছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের গত ছয় বছরের আমন মৌসুমের ক্রয়প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫০ লাখ টন চাল কেনা হয়। ধান কেনার লক্ষ্য থাকে ২ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন। তবে গত বছর এর ব্যতিক্রম হয়েছিল। মাত্র ৫০ হাজার টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। চাল কেনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল সাড়ে ৬ লাখ টন। কৃত্রিমভাবে সেচের খুব একটা প্রয়োজন না পড়ায় আমনে বোরো মৌসুমের চেয়ে চালের উৎপাদন-খরচ ছিল, তবে চাল ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য সে বছর কেজিতে চালের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৩ টাকা, আর ধানের দাম বাড়ানো হয়েছিল মাত্র ১ টাকা।
ব্যবসায়ীদের ব্যাপক আগ্রহ ও চাপের কারণে সে বছর বাড়তি আরও আড়াই লাখ টন চাল সংগ্রহ করেছিল খাদ্য বিভাগ, যা ছিল গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চাপ ছিল গত বোরো মৌসুমেও। নির্ধারিত পরিমাণ চাল কেনার পরও আরও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন চাল কিনেছে সরকার।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামগ্রিক বিষয় সামনে রেখেই ধান-চাল কেনার পরিমাণ নির্ধারণ এফপিএমসি। যেহেতু কেনাকাটা কয়েক মাসজুড়ে চলবে, তাই এখানে গুদামে জায়গার সমস্যায় পড়তে হবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য : গত বছর আমন মৌসুমে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৯ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি মৌসুমেও ভালো ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের উচিত কৃষক যাতে উপকৃত হয় সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া।