আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দীর্ঘ ১০ মাস পর শুরু হয়েছে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। তবে প্রথম দিনেই নির্ধারিত হারের চেয়ে সাত গুণেরও বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে রয়েছে জাহাজের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন। দীর্ঘদিন পর দ্বীপে চলতি পর্যটন মৌসুমে জাহাজ আসায় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মনে স্বস্তি ফিরলেও, অতিরিক্ত ভাড়া ও বাড়তি যাত্রী নেওয়ায় অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে পর্যটক এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাট থেকে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েই সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা করে জাহাজ ‘এমভি বার আউলিয়া’। চলতি মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটককে দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এজন্য জেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে তিনটি জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়। ট্যুরিজম বোর্ডের ট্রাভেল পাস ও জাহাজ কর্র্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রথম দিনে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন ৮৮৬ জন পর্যটক। তবে যাত্রী কম হওয়ায় শেষ মুহূর্তে যাত্রা বাতিল করা হয় ‘এমভি কর্ণফুলী’ জাহাজের। ফলে এমভি বার আউলিয়ার ৮৮৬ জন পর্যটককেই তুলে দেওয়া হয় এই জাহাজে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আরও প্রায় ২০ জন সাংবাদিক, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রায় ৫০ জন। অথচ জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৮৫০ জন। সে সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে পর্যটকদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তাদের অভিযোগ, কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার। সরকারি নিয়ম (বিআইডব্লিউটিএ) অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩ টাকা ১৭ পয়সা। সে হিসাবে সর্বনিম্ন ভাড়া হওয়ার কথা মাত্র ৩০১ টাকা। কিন্তু চলতি মৌসুমের প্রথম জাহাজে সর্বনিম্ন ভাড়া নেওয়া হয়েছে ২২০০ টাকা! এটি সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৭ গুণেরও বেশি। এই ঘটনায় পর্যটকরা যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষও বিব্রত। তারা জানান, আগামী ৯ নভেম্বর সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে নতুন ভাড়া ঠিক করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘এমভি বার আউলিয়া’ জাহাজটি সরকারিভাবে ২০২২ সালে আনা হয় চীন থেকে। শুরুতে এটি চলাচল করেছে চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে। ১৪৫ কিলোমিটারের সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে জাহাজটির সময় লাগত সাড়ে ৬ ঘণ্টা। তখন নন-এসি শোভন চেয়ারের সর্বোচ্চ ভাড়া ছিল ৬৫০ টাকা। কিন্তু পরের বছর জাহাজটি লিজ দেওয়া হয় ‘কর্ণফুলী ক্রুজ লাইন’ নামের একটি বেসরকারি কোম্পানির কাছে। তারা জাহাজটি আধুনিকায়ন করে সেন্টমার্টিন রুটে চালু করে। এখন দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার কমলেও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২২০০ টাকা।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী হাতিয়ার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, হাতিয়া রুটে এই জাহাজের ভাড়া ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এখন দূরত্ব কমলেও ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২২০০ টাকা! এটা অযৌক্তিক। গ্রুপ ট্যুরে আসা নওরীন নেওয়াজ বলেন, ভাড়া অনেক বেশি। যদি পর্যটন জোন হিসেবেই এই ভাড়া নেওয়া হয়, তবে তা দ্বীপের উন্নয়নে খরচ করা উচিত এবং সে হিসাব সবার সামনে প্রকাশ করা দরকার। কুয়াকাটার বাসিন্দা খালেদ হোসাইন জানান, ঢাকা-পটুয়াখালী ২৫২ কিলোমিটার রুটে দেশের সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ চলে। কিন্তু সেখানেও এত বেশি ভাড়া নেওয়া হয় না।
ভাড়ার এই লাগামহীন চিত্রে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারাও বিব্রত। বিআইডব্লিউটিএ’র চট্টগ্রাম দপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নয়ন শীল বলেন, সুন্দরবনের মতো এখানেও আমরা ভাড়া নির্ধারণ করিনি। তবে পর্যটকদের অভিযোগের পর এখন ভাড়া নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।
তবে জাহাজমালিকরা এই ভাড়াকে বেশি বলতে নারাজ। তাদের দাবি, বছরের মাত্র চার মাসের আয় দিয়ে সারা বছর কর্মচারীদের বেতন ও জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এ ছাড়া ঘাটের ইজারা ও সরকারি নানা খরচ রয়েছে। সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (স্কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, টিকিটের দামে শুধু জাহাজ ভাড়া থাকে না। এর সঙ্গে পরিবেশ ফি, ঘাটের ইজারা, ট্যুর অপারেটরদের ১০ শতাংশ কমিশন, সেবা চার্জ, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির টাকা এবং জ্বালানি খরচ যুক্ত থাকে।
যদিও টিকিটের গায়ে এই খরচের কোনো বিবরণ লেখা থাকে না। এ ছাড়া এখন অনলাইনে এনআইডি দিয়ে টিকিট ও ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন দিয়ে পরিবেশ ফি বাতিল করেছে। তাই জাহাজমালিকরা কীসের পরিবেশ ফি নিচ্ছেন, তা আমার জানা নেই। অন্যদিকে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি জানায়, তারা জনপ্রতি ২০ টাকা করে নেন।
বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. আলমগীর কবীর বলেন, আমরা সাধারণত লঞ্চের ভাড়া ঠিক করি, পর্যটন জোনের নয়। তবে ঢাকা-পটুয়াখালী রুটের চেয়েও সেন্টমার্টিন রুটের ভাড়া অনেক বেশি, যা পর্যটনে খারাপ প্রভাব ফেলছে। আগামী ৯ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে একটি সমন্বয় সভা ডাকা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সভায় পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও জাহাজমালিকরা থাকবেন। বৈঠকের পরই ভাড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। তিনি আরও জানান, ঘাটের রাজস্ব বাবদ বিআইডব্লিউটিএ ৫০ টাকা নেন, যা টিকিটের সঙ্গে যুক্ত আছে। আগামী বৈঠকে টিকিটের গায়ে কার কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তা আলাদাভাবে লিখে রাখার বিষয়েও আলোচনা হবে।
এদিকে, দীর্ঘ ৫ ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে গতকাল বেলা সোয়া ১টায় ‘এমভি বার আউলিয়া’ জাহাজটি সেন্টমার্টিন দ্বীপে নোঙর করে। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের দেখে উল্লাসে ফেটে পড়েন সেন্টমার্টিনবাসী। তারা ফুল দিয়ে পর্যটকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দ্বীপে পৌঁছে প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিন দেখার অনুভূতি প্রকাশ করে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর পর্যটক ইসরাত জাহান বলেন, জাহাজ থেকে নীল সমুদ্রের পানি দেখে মন ভরে গেছে। সেন্টমার্টিনে নামার পর যে অনুভূতি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। দ্বীপে প্রথম দিনের পর্যটকদের রেখে বিকেল সাড়ে ৩টায় জাহাজটি উদ্বোধনী যাত্রার সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের নিয়ে পুনরায় কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেয়। গতকাল বৃহস্পতিবার কোনো পর্যটক ফিরে আসেননি। ৮৮৬ জন পর্যটকের সবাই দ্বীপে রাত যাপন করছেন এবং আজ শুক্রবার বিকেলে তারা একই জাহাজে ফিরবেন।