৭ নভেম্বরের কিছু অজানা তথ্য

বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশ কটি সংকট মুহূর্ত এসেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি মুহূর্ত ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। এই নির্ধারণী প্রক্রিয়াটি আমাদের জাতি গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রথম সংকট মুহূর্তটি এসেছিল ১৯৭১-এ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার অভিযানের মধ্য দিয়ে। জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করলেন।

দেশবাসীকে দিয়ে গেলেন না কোনো দিক নির্দেশনা। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করতে অস্বীকার করেছিলেন। দেশবাসী তখন হতবিহ্বল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই বুঝি আমাদের সব আশার প্রদীপগুলো নিভে গেল। এমনই এক পরিস্থিতিতে ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান বজ্রকণ্ঠে ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। তদুপরি ২৬ মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। তার এই ঘোষণা দেশবাসী বেতারের মাধ্যমে শুনেছে। মুহূর্তের মধ্যে দিশাহারা দেশবাসী সম্বিত ফিরে পেল। তারা জানল, সব শেষ হয়ে যায়নি। দিগন্তে নতুন সূর্যোদয় হয়েছে।

তখন জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সৈনিক। সামরিক বাহিনীর একজন মেজর। তার নাম দেশবাসী জানত না বললেই চলে। যদিও ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি খেমকরন সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ সৃষ্টি করে সেদিনকার ভারতীয় সৈন্যদলকে পরাস্ত করেছিলেন। বীরত্বের জন্য তিনি হিলাল-ই জুরাত উপাধি পেয়েছিলেন। মেজর জিয়ার সাহসিকতাপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘোষণায় তার নাম বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই মুহূর্ত থেকে একজন অপরিচিত মেজরের সঙ্গে দেশবাসীর আত্মার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। সেদিন যদি মেজর জিয়া এই ঘোষণা দিতে না পারতেন, তাহলে আমাদের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।

আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে প্রথম সপ্তাহ ছিল আরেকটি সংকট মুহূর্ত। এর আগে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশালী শাসন উচ্ছেদ হয়। দুই কন্যা ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি খন্দকার মোশতাক আহমদ। নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেলেন আওয়ামী লীগ দলীয় ব্যক্তিরা, যাদের অনেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। খন্দকার মোশতাক আহমদ বাকশাল বিলুপ্ত ঘোষণা করে রক্ষীবাহিনীকে সামরিক বাহিনীতে আত্মীকৃত করেন। উল্লেখ্য, দেশে খাদ্যশস্যের দাম হ্রাস পায়। এরপর আসে ৩ নভেম্বর। এই দিন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানে বিমানবাহিনীর কতিপয় অফিসারও অংশগ্রহণ করেন। সেদিন বিমানবাহিনীর দুটি জেট আকাশ থেকে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী ট্যাংক বাহিনীকে হুমকি প্রদান করে। ৩ নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চার আওয়ামী লীগ নেতা নিহত হন। বন্দি অবস্থায় এই নেতৃবৃন্দের হত্যাকাণ্ড মানুষের জীবনের মূল্যের প্রতি চরম অশ্রদ্ধার নিদর্শনে পরিণত হয়।

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ছিলেন একজন উচ্চাকাক্সক্ষী সামরিক অফিসার। ১৫ আগস্টের ঘটনার বেশ কিছু দিন আগে তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদাৎ চৌধুরীকে বলেছিলেন, আমার অভ্যুত্থানটি ঘটবে ১৯৭৮ সালে। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর তিনি অভিযোগ করতে থাকেন, সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। যারা চেইন অব কমান্ড ভাঙার জন্য দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এই অজুহাতগুলো ছিল খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান ঘটানোর পাঁয়তারা। তিনি আরও বলেছিলেন, জিয়া যদি এক পা আগান তাহলে আমি দুই পা আগাব। জিয়াউর রহমান সেই সময় ছিলেন সেনাপ্রধান। ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে খালেদ মোশাররফের অনুগতরা গৃহবন্দি করে। দেশে তখন এক ভয়াবহ থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। দেশবাসী দেখছিল, দেশে কোনো সরকার নেই। রেডিও-টেলিভিশন থেকে কোনো সরকারের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল না। খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করেন। দেশবাসী চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। তারা প্রমাদ গুনল, ফের বাকশালী শাসনের প্রত্যাবর্তন ঘটছে। দেশ আবার ভারতীয় আধিপত্যবাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বামপন্থি নেতা মোহাম্মদ তোয়াহার কাছ থেকে একটি ঐতিহাসিক কাহিনি শুনেছিলাম। অভ্যুত্থানকারীরা মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, তারা ‘মার্কিনপন্থি’ সরকারের অবসান ঘটাতে চান। মোহাম্মদ তোয়াহা বলেছিলেন, খন্দকার মোশতাকের সরকারকে দেশবাসী ভারতবিরোধী সরকার বলে মনে করে। তার সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানো মানেই ভারতের ক্রীড়নক হিসেবে পরিচিত হওয়ার ঝুঁকি গ্রহণ। এর জবাবে অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, খন্দকার মোশতাক ঠুঁটো জগন্নাথ মাত্র। মোহাম্মদ তোয়াহা বলেছিলেন, রথযাত্রায় ভক্তরা নত হয়ে এই ঠুঁটো জগন্নাথকেই প্রণাম করে। সুতরাং মোশতাকবিরোধী অভ্যুত্থান জনগণের কাছে ভারতপন্থি অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত হবে। তাই এই অভ্যুত্থান থামিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু অভ্যুত্থানকারীরা জানাল, সামরিক বাহিনীতে একটি নির্দেশনা ঘোষিত হলে তা পাল্টানো যায় না। এভাবেই অভ্যুত্থানকারীদের শেষ পরিণতি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

এর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতে বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ দেখা দেয়। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামে রাশি রাশি ইশতেহার প্রচারিত হয়। এই ইশতেহারে দেশের পরিস্থিতির জন্য সেনা অফিসারদের দায়ী করা হয়। সেøাগান তোলা হয়, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’। সেদিন অফিসারদের নিশ্চিহ্ন করার উসকানিটা এসেছিল সামাজিক বিপ্লবের তত্ত্ব প্রচারকারী একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে। সৈনিকরা এমনই এক উত্তাল পরিস্থিতিতে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে কামান দেগে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। সামাজিক বিপ্লবীরা ভেবেছিল, তারা জিয়াউর রহমানকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবে। তাদের সেই অভিপ্সা পূরণ হয়নি। জিয়াউর রহমান তাদের ফাঁদে পা দেননি। অন্যদিকে সামাজিক বিপ্লবীরা ভয়াবহ এক ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা চেয়েছিল অফিসার শূন্য করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করা এবং এরই মধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। অভ্যুত্থানকারী সিপাহিরা ঠিকই ধরে নিয়েছিলেন, খালেদ মোশাররফ ও তার চক্র আধিপত্যবাদেরই প্রত্যাবর্তনের প্রয়াস পেয়েছে।

ভোরের আলো ফুটে উঠতে না উঠতেই সিপাহিরা সামরিক যান ও ট্যাংক নিয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে পড়লেন। তারা সেøাগান তুললেন, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ এবং বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’ শঙ্কা ও হতাশায় মুহ্যমান ঢাকা নগরবাসী রাজপথে বিপ্লবী সেনাদের দেখে প্রাণ ফিরে ফেল। তারাও শত-সহস্র মিলে সিপাহিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করল। কেউবা ট্যাংকের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দিল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম দেখা একটি জাতি নতুন করে নিজেদের আবিষ্কার করল। তাদের মনে দৃঢ় আস্থার সৃষ্টি হলো, এ দেশকে কেউ চাইলেই পদানত করবে না। জুলাই চব্বিশও তার এক নিদর্শন। জিয়াউর রহমান সৈনিকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। জনগণের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা ছিল অপরিসীম। এই জনপ্রিয়তার শক্তিকে ব্যবহার করে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন। অফিসার হত্যার ঘৃণ্য চেষ্টাকে প্রতিহত করলেন। যদিও কয়েকজন সেনা অফিসার নিহত হয়েছিলেন।

১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগসন্ধিক্ষণ। এই সন্ধিক্ষণে সর্বাগ্রে প্রধান হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এই দিবসটির শিক্ষা হলো, সৈনিক-জনতার দুর্ভেদ্য ঐক্যের ব্যূহ সৃষ্টি করে  দেশকে আধিপত্যবাদের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত রাখা। রাষ্ট্রপতি  শহীদ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালিত হয়েছিল। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস জিন্দাবাদ। ৭ নভেম্বর অমর হোক। অমর হোক শহীদ জিয়ার অম্লান স্মৃতি।

লেখক : জাতীয় অধ্যাপক