অন্য আলোয় ৭ নভেম্বর

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০২ এএম

আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। দেশের ইতিহাসের ঘটনাবহুল একটি দিন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে উৎসব-আনন্দে আজ শনিবার উদযাপিত হবে। চলতি মেয়াদে বিএনপি সরকার গঠনের পর আবার দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হচ্ছে। সরকারের তালিকায় এটি এখন ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস।

দিনটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সরকারি ও দলীয় পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়োজন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। রাজধানীতে এ শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেল ৩টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শোভাযাত্রার উদ্বোধন ঘোষণা করে বক্তব্য দেবেন। এতে বিএনপির কেন্দ্রীয়, মহানগর এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। উভয়েই জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয় এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার ওপর রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় সংকট উত্তরণের দায়িত্ব অর্পিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় সর্বদা সংহতি ও ঐক্য প্রকাশ করেছে। সেই একই চেতনা পুনর্জাগরিত হয় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে। এ সময় ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের সুদৃঢ় ঐক্যে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বিপর্যয় থেকে আবারও রক্ষা পায় প্রিয় স্বদেশ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের পথ নির্ধারণের ঐতিহাসিক দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, তাদের পরাজয় ঘটেছিল এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। ১৯৭৫ সালের পরাজিত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক আগামীদিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রেরণা। ।

১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ : স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকটে ১৯৭৫ সালে দেশের পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর ভোরে সেনানিবাসে সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। সৈনিকদের একটি অংশ জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। পরে সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ও ‘মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন এলাকা। সেদিন বেতারে আবারও শোনা যায় জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ ‘আমি জিয়া বলছি’। সেদিন মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও তার কয়েকজন সহযোগী নিহত হন। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে জাসদ। জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান নিয়ে ইতিহাসে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।

সরকারি অনুষ্ঠানমালা : দিবসটি উপলক্ষে আজ সাধারণ ছুটি। দেশের সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সাজানো হয়েছে জাতীয় পতাকায়। মসজিদে মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশুকেন্দ্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। শিশুদের জন্য দেশের সব শিশুপার্ক দিনব্যাপী বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটি থাকলেও আলোচনা সভা, আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে।

জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। সংবাদপত্রে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং টেলিভিশন ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেশাত্মবোধক গানের আয়োজন, আলোচনা সভা ও প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। সশস্ত্র বাহিনীর উদ্যোগে পতাকা উত্তোলন, মিলাদ, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবার হবে। আর্মি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্যাডেট কোরের বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শিত হবে। পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কোস্ট গার্ড, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ আয়োজন থাকবে।

এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকিট, ১০ টাকা মূল্যমানের উদ্বোধনী খাম এবং পাঁচ টাকা মূল্যমানের ডেটা কার্ড অবমুক্ত করেছেন। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিশেষ সিলমোহর ব্যবহার করে ডাকটিকিটটি অবমুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, বাংলাদেশ ডাক বিভাগের উদ্যোগে প্রকাশিত ডাকটিকিটটি দেশের সব ডাকঘরে বিক্রি হবে।

বিএনপির ব্যাপক কর্মসূচি : জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি উদযাপন করছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার নয়াপল্টনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ রাজধানী ও সারা দেশে শোভাযাত্রা হবে। ৮ নভেম্বর থানা ও উপজেলাপর্যায়ে শোভাযাত্রার পাশাপাশি ছাত্রদলের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ৭ নভেম্বর বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং ওলামা দলের উদ্যোগে এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হবে। ৯ নভেম্বর কৃষক দলের আলোচনা সভা এবং জাসাসের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। ১০ নভেম্বর যুবদলের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

রিজভী বলেন, অতীতের ইতিহাস অস্বীকার করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সাধারণ মানুষের ওপর ভয়ংকর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ৭ নভেম্বর দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন হয় এবং জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রচর্চার ব্যবস্থা করেন। তার মতে, একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণ বারবার রাজপথে নেমেছে; এর উদাহরণ এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত