৭ নভেম্বর না এলে কী হতো বাংলাদেশের

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০০ এএম

৭ নভেম্বর নিয়ে গত দেড় যুগ নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে, ছড়ানো হয়েছে বিভ্রান্তি। এমনকি সাধারণ ছুটির সরকারি তালিকা থেকে ৭ নভেম্বর বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে সেটা নিয়ে কোনো কথা বা আলোচনা না হতে পারে। স্বাভাবিক প্রশ্ন এমন হতেই পারে কেন এমন বিরাগ এই দিনকে নিয়ে? ৭ নভেম্বর শুধু কি একটা সংখ্যা ক্যালেন্ডারের পাতায়? আসলেই কি সেটা সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব? অনিবার্য ছিল কি ৭ নভেম্বর? এই বিপ্লবের কতটা নির্মোহ বিশ্লেষণ হয়েছে এতদিন? একটু পেছন থেকে শুরু করা যাক। ১৫ আগস্ট তখনকার রাষ্ট্রপতি নিহত হন তার পরিবারের সদস্যসহ। যেকোনো হত্যাকাণ্ডই মর্মান্তিক বলাবাহুল্য। কিন্তু দেশের জনগণ এমনকি তার দলও সেই হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদী হলো না। পরদিনের পত্রিকাগুলোতে যে শিরোনাম হলো তাতে অবিসংবাদিত নেতৃত্বের গুণাগুণ তো দূরে থাক, নেহায়েত সাদামাটা শোক গাঁথাও প্রকাশিত হলো না। বাকশালের আবির্ভাবে তখন তো সরকার নিয়ন্ত্রিত দুটো বাংলা আর দুটো ইংরেজি মিলিয়ে পত্রিকার সংখ্যা চার। সেদিন ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ’। এর  প্রথম পাতার প্রথম কলামে প্রকাশিত সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’। দৈনিক বাংলা শিরোনাম করেছিল ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি’, আর সম্পাদকীয় শিরোনাম ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’। আগের দিন ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ, কোনো খবর নেই বরং ইতিবাচক পরিবর্তনের গুণাগুণ। তখন সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন জেনারেল সফিউল্লাহ, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য।

১৫ আগস্ট থেকে কার্যকারিতা দিয়ে ২০ আগস্ট ১৯৭৫ খন্দকার মোশতাক সামরিক শাসন জারি করলেন। আওয়ামী সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ তখনো বহাল। সংবিধান নিয়ে কোনো কথা নেই। সব বাহিনী প্রধান মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য ও সহযোগিতার প্রত্যয় ঘোষণা করলেন প্রচার মাধ্যমে। আগস্ট পঁচাত্তর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা ট্যাংক আর ভারী অস্ত্র নিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন বঙ্গভবনে। বলতে গেলে সেনা কমান্ডের বাইরে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের একান্ত সান্নিধ্যে। দেশে তখন চরম অনিশ্চয়তা, তেয়াত্তর-চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ তখনো নিঃশেষ হয়নি। রাস্তায় কঙ্কালসার অনাহারপিষ্ট মৃতদেহ যত্রতত্র। নিত্যপণ্য বাজার থেকে উধাও। আইনশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত। এর মধ্যে ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ উপপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হলেন। সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ হলেন রাষ্ট্রদূত। চতুর খন্দকার মোশতাক জেনারেল জিয়াকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করলেও তার ওপর অন্ধ আনুগত্যের আস্থা রাখতে পারেননি। ফলে সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি করে সেনাবাহিনীতে জেনারেল জিয়ার কমান্ড প্রতিষ্ঠার অন্তরায় সৃষ্টি করতে তার ওপরে বসিয়ে দিলেন আরও দুজনকে। জেনারেল খলিলুর রহমানকে নিযুক্ত করলেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনা-নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানদের নিয়ন্ত্রক এবং আরও নিচ্ছিদ্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে জেনারেল ওসমানীকে দিলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পদ। এরা দুজনেই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেনারেল জিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে নানা অজুহাতে অসহযোগিতা করতেন। একই সময়ে সিজিএম জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও ৪৬ ব্রিগেড প্রধান শাফায়াত জামিল সেনাবাহিনীতে কমান্ড ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সেনাপ্রধানদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেনাবাহিনীতে ভিন্ন ধারা প্রতিষ্ঠার একটা সাজানো পরিকল্পনার সপক্ষে জোরেশোরে মাঠে নামলেন।

২ নভেম্বর রাতে ৪৬ ব্রিগেডের সহায়তায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ সূচিত হলো। বন্দি হলেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া খালেদ মোশাররফ সারাদিন ধরনা দিয়ে খন্দকার মোশতাকের কাছে সেনাপ্রধান পদে নিযুক্তির কৃপা প্রার্থনা করে সফল হলেন ৩ নভেম্বর রাতে। ৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রাশেদ মোশাররফ ও তাদের মা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সমর্থনে আওয়ামী নেতাকর্মীর মিছিল নিয়ে পুষ্পমাল্য দিতে গেলেন ধানম-ির ৩২ নম্বরে। ৩ নভেম্বর রাতে সংঘটিত হলো জেলহত্যা ও একই রাতে খালেদ মোশাররফদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে ফারুক, রশিদ, ডালিম, হুদা, নূর, পাশা, মোসলেহ উদ্দিনরা বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ-২৭ ফ্রেন্ডশিপ বিমানে সপরিবারে ব্যক্তিগত মালামালসহ নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় উড়ে গেলেন ব্যাংককে। এমনকি ওই দীর্ঘ পথ ফকার বিমান একেবারে পাড়ি দিতে পারবে না বলে চট্টগ্রামে একবার জ্বালানি ভরার ব্যবস্থাও হলো পরিকল্পনা মাফিক। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে ব্যক্তিস্বার্থের এই কর্মকাণ্ডগুলো সাধারণ সৈনিকরা মোটেও পছন্দ করেনি। তাদের ভেতর ক্ষোভ ও প্রতিবাদ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, অন্যদিকে খালেদ মোশাররফের তথাকথিত অভ্যুত্থান ও তার সমর্থনে উল্লসিত আওয়ামী মিছিল, স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত বাংলাদেশে শান্তির নিঃশ্বাস নেওয়া দেশবাসীকে বাকশালী নির্যাতনের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কায় শঙ্কিত করে তোলে। তারাও এই অপশক্তির হাত থেকে পরিত্রাণের প্রতীক্ষায় ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হলো বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফার প্রচারণা। দেশের মানুষের তখন প্রতীক্ষা ছিল এমন একজন নেতার যিনি এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দিতে শক্ত হাতে দেশের হাল ধরবেন। আর সেনাবাহিনীর প্রত্যাশা ছিল তাদের গ্রহণযোগ্য ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব। খালেদ মোশাররফের হাতে জেনারেল জিয়ার বন্দিত্ব তারা সহজে গ্রহণ করেননি। ফলে সিপাহি-জনতা উভয়েরই প্রত্যাশার একক ঠিকানা মিলিত হলো একটি নামে ‘জিয়াউর রহমান’। দেশপ্রেমিক সৈনিকরা ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করলেন তাদের উপযুক্ত প্রধান জেনারেল জিয়াকে আর স্বতঃস্ফূর্ত জনতা ও দেশবাসী ১৯৭১ এর ২৬ মার্চের মতো আবারও আশ্বস্ত হলো যে দেশের ক্রান্তিকালে পরীক্ষিত অসম সাহসী দেশপ্রেমিক সেদিনের মেজর জিয়া ১৯৭৫ এর নভেম্বরে আবারও এই অনিশ্চিত ক্রান্তিকালে ঠিক সময়ে দেশের হাল ধরেছেন।

জাসদ সমর্থিত সৈনিকদের একটি দল কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুদের প্ররোচনায় ১২ দফা দাবির সঙ্গে অদ্ভুত কিছু সেøাগানে ঢাকা সেনানিবাসকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করল। ‘সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই অফিসারদের রক্ত চাই’ এই ছিল স্লোগান। এই রক্ত হোলিতে নারী চিকিৎসকসহ নিহত হলেন ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা। ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে বিশৃঙ্খল ও দিশাহীন বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল জিয়াউর রহমানের সামনে। পূর্বঘোষিত সামরিক শাসনামলের প্রধান ছিলেন বিচারপতি আবু সায়েম। জিয়া ও অন্যান্য বাহিনী প্রধানরা ছিলেন উপ-প্রধান। একটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আমাদের সামনে এখনো আছে। ৭ নভেম্বর না এলে কী হতো বাংলাদেশের? আমাদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার একটা আশঙ্কা সেদিন অবশ্যই ছিল। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসার আশঙ্কাও ছিল।

একদলীয় বাকশালের নিষ্পেষণে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন আর প্রত্যাশা হয়তো আজন্ম অধরাই থেকে যেত। এইসব অবশ্যম্ভাবী আশঙ্কাগুলো সত্যি হয়নি সেটা হয়তো আমাদের অদেখা স্বস্তি। কিন্তু ৭ নভেম্বর থেকে আমাদের প্রাপ্তির তালিকা অনেক দীর্ঘ। ৭ নভেম্বর আমাদের মুক্তি দিয়েছে একদলীয় বাকশালের দুঃশাসন থেকে। দিয়েছে চারটি সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশনা থেকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। দিয়েছে অভিন্ন জাতীয়তার পরিচয় :  ধর্ম-বর্ণ, গোত্র-গোষ্ঠী, ভাষা-সংস্কৃতি, পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে সম-অধিকারের জাতীয়তা ‘বাংলাদেশি’। সমাজতন্ত্রের সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ধারণার বিপরীতে স্বাচ্ছন্দ্য আর অবারিত মুক্তবাজার অর্থনীতি। আমাদের বেকার যুবশক্তির জন্য অবারিত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার। নারীদের জন্য স্বাধীন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ। সাহায্য-নির্ভর অর্থনীতি প্রতিস্থাপিত হয়েছে রেমিট্যান্স আর তৈরি পোশাকভিত্তিক দৃঢ় আর্থিক ভিত্তিতে। দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশ হয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে মর্যাদায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে। মুসলিম বিশ্বে পেয়েছে সম্মানের আসন। ওআইসির সম্মানজনক কমিটিতে দায়িত্বপূর্ণ পদ।

আর সবকিছু ছাপিয়ে নিশ্চিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব। যুগে যুগে এমনিভাবেই ইতিহাস বীরত্বগাথা লেখে আর একটা জাতি পায় তার যোগ্য সন্তানকে ঠিক ক্রান্তিলগ্নে। ৭ নভেম্বর আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো আরেকটি অমর বীরত্বগাথা। সিপাহি-জনতার ঐক্য ও সংহতি প্রকাশের অনন্য ইতিহাস রচনা। ঐক্যের এই স্রোতধারা অব্যাহত থাকলে নিরাপদ বাংলাদেশ, নিরাপদ আমাদের ভূখণ্ড ও সীমান্ত, নিরাপদ আমাদের আগামীর প্রজন্ম।

লেখক : আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত