কার্পাস তুলা এবার সিলেটে

সিলেট বিভাগে প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশীদ্রোন ইউনিয়নের সাইটুলা গ্রামে শুরু হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে কার্পাস তুলা চাষ। এ তুলা চাষাবাদে অন্য ফসলের তুলনায় খরচ কম এবং লাভও বেশি। ওই গ্রামের মৃত মধুসূদন কুর্মীর ছেলে তাপস কুমার কুর্মী (৪০) প্রায় সাড়ে চার একর জমিতে তুলা উন্নয়ন বোর্ড উদ্ভাবিত ‘সিবি হাইব্রিড-১’ জাতের তুলা রোপণ করেছেন। এরই মধ্যে তুলা গাছগুলোতে এসেছে সাদা ও গোলাপি রঙের মনোরম ফুল। এতে খুশিতে আত্মহারা কৃষক তাপস কুর্মী।

সিলেট বিভাগ কৃষির এক উর্বর ভূমি। সব ধরনের শষ্য, মশলা, শাকসবজি, ফলমূলের চাষাবাদ হয় এ অঞ্চলে। তবে এখানে কখনোই বাণিজ্যকভাবে তুলা চাষাবাদ হয়নি। সিলেট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু তুলা চাষাবাদের উপযোগী। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এ অঞ্চলে তুলা চাষ সম্প্রসারণে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. রেজাউল আমিনের নির্দেশে বোর্ডের ঢাকা জোনের স্টোর কাম ফিল্ডম্যান শুক দেব রায় মৌলভীবাজারে আসেন এবং তুলা চাষাবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেন। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় সিলেট বিভাগের মধ্যে প্রথম বাণিজ্যকভাবে তুলা চাষাবাদে এগিয়ে আসেন তাপস কুমার কুর্মী। চলতি বছরের ২৩ জুলাই তিনি প্রায় সাড়ে চার একর জমিতে ‘সিবি হাইব্রিড-১’ জাতের তুলা রোপণ করেন। তার রোপণ করা কার্পাস তুলা গাছগুলো বেড়ে উঠছে। ফুলে ফুলে ভরে গেছে অধিকাংশ গাছ। আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে তিনি ফসল তুলতে পারবেন। তুলা উন্নয়ন বোর্ড ঢাকা জোনের সূত্র জানায়, কার্পাস তুলার বৈজ্ঞানিক নাম গসিপিয়াম হার্বেসিয়াম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, আমেরিকা, আফ্রিকা ও সুদান ইত্যাদি দেশ কটনশিল্পে কার্পাস তুলার ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশেও কটনশিল্পের নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। বর্তমানে তুলার বৈশ্বিক উৎপাদন বার্ষিক ২৫ মিলিয়ন টন। আমাদের দেশের তুলা উন্নয়ন বোর্ড শুধু কৃষকদের প্রণোদনা, বীজ, সার দিয়ে সহযোগিতাই করছে না; তাদের  চাষাবাদকৃত তুলা ৪ হাজার টাকা মন দরে মাঠ থেকে কিনে নিচ্ছে।

তুলাচাষি তাপস কুর্মী বলেন, ‘এটি একটি লাভজনক ফসল। প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ মণ তুলা হবে। সার-মাটি তুলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে দিয়েছে। আমার সাড়ে চার একর জমিতে তুলা চাষ করতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রথমবারের মতো সাইটুলা গ্রামে তুলা আবাদ হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলে তুলা আবাদের জন্য মাঠ উপযোগী; আমরা এ বছর চার একর জায়গায় তুলা চাষাবাদ করেছি। ওখানে মোটামুটি একটা হিসাব করেছি যে, অন্তত ৬০ মন ফসল আমরা ওখান থেকে উত্তোলন করতে পারব। সামনে আরও তুলা চাষের জন্য আরও জায়গা চিহ্নিত করেছি। এই জায়গাগুলো শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে চাষের আওতায় আনার চেষ্টা করতেছি, যাতে তুলা উৎপাদন বাড়ানো যায়।’

তুলা উন্নয়ন বোর্ড ঢাকা জোনের স্টোর কাম ফিল্ডম্যান বর্তমানে মৌলভীবাজারে কার্পাস তুলা সম্প্রসারণে নিযুক্ত শুক দেব রায় বলেন, ‘এ অঞ্চলে তুলা চাষাবাদ নেই।  শ্রীমঙ্গলে তুলা চাষের প্রচুর উপযুক্ত জায়গা আছে। সিলেট অঞ্চলে আমাদের প্রথম চাষি তাপস কুর্মী। আমরা বোর্ডের পক্ষ থেকে সার, বীজ দিয়েছি। স্থানীয় কৃষি অফিসের সাথে আমাদের যোগাযোগ আছে। তারা আমাদের সহযোগিতা করছে। আশা করছি বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মন ফসল পাব।’

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক (স. দ.) মো. কুতুব উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের মূলত ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটা টার্গেট আছে, দেশে ৫ লাখ বেল তুলা উৎপাদন করার। আমরা বর্তমানে ২ লাখ বেল উৎপাদন করি। সেখানে আমাদের এরিয়া অবশ্যই বাড়াতে হবে। আমরা গতবার একটা জরিপ করেছি। মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জকে টার্গেট করছি। এখানে একটু উঁচু জমি বেশি আছে।’

তিনি বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে আমরা একটা প্রজেক্ট সাবমিট করেছি। বাংলাদেশে মোটামুটি ৮৫ লাখ বেল তুলা লাগে। সেখানে আমরা মাত্র ২ লাখ বেল করি। তুলা আমদানিতে আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ বের হয়ে যায়। আমরা যদি ১ কেজি তুলাও উৎপন্ন করি, তাহলে সেটা ৩ ডলার সেভ হয়। সিলেট অঞ্চলে তুলা চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্য এ কারণেই। আমাদের যে গার্মেন্টস শিল্প এটার এক্সপোর্টের একটা বড় আর্নিংস আমাদের আসে বাইরে থেকে। এই কারণে আমাদের তুলাটা সিলেট অঞ্চলসহ সর্বত্র সম্প্রসারণ করছি।’