অপহরণ পাচার হত্যার বিভীষিকা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৬ এএম

কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গত তিন বছরে এই অঞ্চলে অপহরণ-বাণিজ্য, মুক্তিপণ আদায়, আন্তর্জাতিক মানব পাচার এবং মাদক চোরাচালানের সিন্ডিকেট আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বনাঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা নুরালীপাড়ার পাহাড়ি এলাকায় মানব পাচারকারী ও সশস্ত্র ডাকাত চক্রের আস্তানায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর সদস্য তিতাস শেখ। অভিযানে যৌথবাহিনী আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এবং বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকসহ ৫৬ জনকে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করে। যৌথবাহিনীর অভিযানকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের (২৮) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার পর ফরিদপুরের নগরকান্দার লস্করদিয়া গ্রামে লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তার জানাজা শেষে স্থানীয় গোরস্থানে নানির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে। মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন।

টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। টেকনাফ উপজেলার পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের আস্তানায় যৌথ অভিযান চলমান থাকবে।

ভয়াল তিন বছরের পরিসংখ্যান : গত তিন বছরে টেকনাফের গহিন পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধী চক্রগুলো ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে অপহরণ করে। তাদের বেশিরভাগই স্থানীয় কৃষক, দিনমজুর, অটোরিকশাচালক এবং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। গত এক বছরেই এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮৫ থেকে ১৯২ জনের কাছাকাছি। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় এবং মাদক চোরাচালানের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে তিন বছরে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। চক্রগুলো শুধু মুক্তিপণের জন্যই মানুষকে জিম্মি করে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে বা সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। জিম্মিদের আটকে রেখে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে টাকা দাবি করা এই চক্রগুলোর নিয়মিত কৌশল।

গত ৩ বছরে পাহাড়ি অঞ্চলে চালানো বিভিন্ন অভিযানে এবং থানায় দায়েরকৃত সুনির্দিষ্ট অপহরণ ও পাচার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ জন সক্রিয় অপহরণকারী, ডাকাত ও মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কান্নায় ভারি পাহাড়ের পাদদেশ : টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় পানের বরজে কাজ করার সময় গত বছর অপহৃত হন স্থানীয় এক কৃষক। জমি বিক্রি করে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা সেই কৃষকের স্ত্রী মরিয়ম বলেন, ‘পাহাড়ে নিয়ে আমার স্বামীকে গাছে ঝুলিয়ে মারধর করে ডাকাতরা। সেই কান্নার শব্দ ফোনে শুনিয়ে আমাদের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে ও ধারদেনা করে টাকা দেওয়ার পর ওনাকে ফেরত পেয়েছি। কিন্তু এখনো রাতে ঘুমাতে পারেন না, ভয়ে আঁতকে ওঠেন। আমরা এখন নিজেদের ভিটেমাটিতেই জিম্মি।’

লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক ভুক্তভোগী মা তার নিখোঁজ ছেলের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে পাহাড়ের জাবু ডাকাত দলের লোকরা তুলে নিয়ে যায়। তারা বলেছিল টাকা দিলে মালয়েশিয়া পাঠাবে, না দিলে মেরে ফেলবে। আমরা গরিব মানুষ, টাকা দিতে পারিনি। এক বছর হয়ে গেল ছেলে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, তাও জানি না।’

পাহাড়ে সক্রিয় ডাকাত দল ও অপরাধী চক্র : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফের বাহারছড়া, হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও জাহাজপুরা অঞ্চলের পাহাড়গুলোতে ডজনখানেক সশস্ত্র গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে অপহরণ ও ইয়াবা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকারী সবচেয়ে বড় ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত নবী হোসেন ডাকাত দল, স্থানীয় চাষি ও কাঠুরেদের জিম্মি করার জন্য কুখ্যাত চাকমা ডাকাত দল, ক্যাম্প ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় নির্যাতন চালিয়ে টাকা আদায়কারী সালমান শাহ ও শফি বাহিনী, খায়ের, পুতিয়া ও জাকির, মো. আলম ডাকাত গ্রুপ এবং বাহারছড়া ও শীলখালী অঞ্চলে সক্রিয় বদরুদ্দোজা ওরফে বদরুজ বাহিনী। এ ছাড়া হাকিম বাহিনী, হাসান বাহিনী, নূর আলম বাহিনী এবং জাবু ডাকাত দল পাহাড়ে সক্রিয়ভাবে জিম্মি ও পাচার-বাণিজ্য পরিচালনা করছে।

অপরাধের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের এই দুর্গম ও সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চলকে অপরাধীরা তাদের একচ্ছত্র অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিল। দুর্ভেদ্য ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় তারা তৈরি করেছে ওয়াচ টাওয়ার, আধুনিক টর্চার সেল ও অস্থায়ী ক্যাম্প। নজরদারি এড়াতে পাহাড়ের গহিনে বাংকার খুঁড়ে অপরাধীরা শুধু সাধারণ দেশীয় অস্ত্রই নয়, বরং ভারী ও আধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছে। যৌথ বাহিনীর ওপর তাদের পাল্টা ও সুসংগঠিত আক্রমণ প্রমাণ করে যে, তারা নিয়মিত সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী আস্তানা গড়ে তুলেছিল।

টেকনাফ মডেল থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘৮ দিন ধরে মানব পাচারকারীরা পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আমাকেসহ শতাধিক বন্দি করে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও পারিনি। পাহাড়ে ৪০-৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারা দল ছিল।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাওসার সিকদার বলেন, ‘পাহাড়কে অপরাধমুক্ত করতে এবং এই চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে আমাদের চিরুনি অভিযান আরও জোরালো করা হচ্ছে।’

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে র‌্যাব ও পুলিশের বিশেষ অভিযানে বেশ কয়েকজন দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে পৃথক তিনটি বড় অভিযানেই ৩০টিরও বেশি অস্থায়ী আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন পর্যন্ত জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত