সিলেটে হৃদয়কাব্য

রক্ত নাকি কথা বলে! তাওহীদ হৃদয়ের নামের পাশে এমন একটা তকমা কয়েক বছর আগেই সেঁটে গেছে। সবাই বলে, ‘চ্যাম্পিয়ন ব্লাড’ তার শরীরে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ^কাপজয়ী দলের সদস্য তিনি। এই শিরোপা এখনো বাংলাদেশ ক্রিকেট তো বটেই, দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং মূল্যবান হয়ে আছে। সে দলের বেশ কয়েকজনই এখন জাতীয় ক্রিকেট দলে নিয়মিত সদস্য। তাদের একজন হৃদয়। হার না মানা মানসিকতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সেটার আরও একবার প্রমাণ দিলেন এই তরুণ। মিরপুরে ছিলেন খলনায়ক, সিলেটে হয়ে গেলেন নায়ক। মাঝখানে সময়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক দিন। অথচ এই কয়েক দিনে একজন ক্রিকেটারের গল্প কতটা বদলে যেতে পারে, এই ব্যাটসম্যান সেটার উদাহরণ লিখলেন আরেকবার।

মিরপুর টেস্টে নিজের উইকেটের মূল্য বুঝতে পারেননি হৃদয়। অপ্রয়োজনীয় দুটি শট খেলে আউট হয়ে নিজের পাশাপাশি দলকেও বিপদে ফেলেন। সেই ব্যর্থতার পর সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে তাকে। এমনকি সিলেট টেস্টের একাদশে তার থাকা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। মুমিনুল হক কনকাশন প্রটোকলের কারণে বাদ না পড়লে হয়তো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই ম্যাচে খেলাই হতো না তার। সেই সুযোগকে কীভাবে ইতিহাসে পরিণত করতে হয়, সেটিই করে দেখালেন হৃদয়। সতীর্থদের একের পর এক বিদায়ের মিছিলের মধ্যেও এক প্রান্ত আগলে রেখে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল রূপ দেন। পরে ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি।

নিজের হতাশা, ব্যর্থতা আর জেদ নিয়ে সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনে খেলা শেষে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেন হৃদয়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘অভিষেক নিয়ে স্বপ্ন ছিল অনেক। কিন্তু ব্যর্থতা এবং হতাশায় জেদ চেপেছিল খুব। তবে বিশ্বাস ছিল আল্লাহ এবং নিজের পরিশ্রমের প্রতি। মহান আল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি আশা পূরণ করলেন।’

হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংস শুধু বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহই নয়, রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙার এক অবিশ্বাস্য কীর্তিও। এতদিন বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক ছিলেন মুশফিকুর রহিম। ২০১৮ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৯ রান করেন তিনি। নিজের প্রিয় ক্রিকেটারের সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস লিখেছেন হৃদয়। সঙ্গে বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির মালিক তিনি। তার আগে এই কীর্তি ছিল মুশফিক, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের। তবে তাদের কেউই নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারেননি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেই অনন্য কীর্তিও নিজের নামে লিখেছেন হৃদয়।

ছক্কার ঝড়েও বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবার ওপরে এখন হৃদয়। এক ইনিংসে ১১টি ছক্কা মেরে ভেঙেছেন তামিম ইকবালের রেকর্ড। ২০১৫ সালে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০৬ রানের ইনিংসে সাতটি ছক্কা ছিল তামিমের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক ইনিংসে ১১ ছক্কা যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। চার-ছক্কার হিসাবেও বাংলাদেশের সবার ওপরে এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। তার ২২টি চার ও ১১টি ছক্কা থেকে এসেছে ১৫৪ রান। বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে এত রান আসেনি। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংসে ৩১টি চার মেরে বাউন্ডারি থেকে ১২৪ রান তোলেন সাকিব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংসও এখন তার। ২০১৮ সালে মিরপুরে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ১৩৮ রান ছিল আগের সর্বোচ্চ। সিলেটের মাঠে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডও এখন হৃদয়ের এই অপরাজিত ২৪২ রানের।

ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি দলের ইনিংসেও হৃদয়ের অবদান অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের মধ্যে একাই ২৪২ করেছেন। অর্থাৎ দলের মোট সংগ্রহের ৬২.৬৯ শতাংশ তার। টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দলের ইনিংসে সর্বোচ্চ অবদানের রেকর্ড এটি। ১৯৬৯ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫৮ রান করার পথে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শিমুর নার্স দলের ৪১৭ রানের মধ্যে ৬১.৮৪ শতাংশ নিজেই করেন। আবার ২৯ রান নিয়ে দিনের খেলা শুরু করে এক দিনেই ২১৩ রান যোগ করেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে এক দিনে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ডও এটি। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এক দিনে ২১২ রান করেন সাকিব।

এমনকি শেষ দিকের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে লড়াইয়েও রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর শেষ তিন উইকেটে যোগ হয়েছে ২০২ রান, যা এই সংস্করণে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ তিন উইকেটে ১৯৮ রান যোগ করেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তাইজুল ইসলামের সঙ্গে অষ্টম উইকেটে হৃদয়ের ১১৭ রানের জুটি সিলেটের মাঠে নতুন রেকর্ড। এর আগে এই মাঠে অষ্টম উইকেটে সর্বোচ্চ জুটি ছিল ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে কামিন্দু মেন্ডিস ও প্রাভাত জায়াসুরিয়ার ৬৭ রান। শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে হৃদয়ের অবদান ছিল ১৭২ রান। অর্থাৎ সতীর্থদের একের পর এক বিদায়ের মধ্যেও একাই লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি।

এসব গল্প আর ইতিহাস লেখেন দলের বিপদের সময়ে। গতকাল অভিজ্ঞ মুশফিকের সঙ্গে বড় জুটি গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু আগের দিনের অপরাজিত ইনিংসটিকে বড় করতে পারেননি মুশফিক। এরপর লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ একে একে ফিরে যান সাজঘরে। ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারানো বাংলাদেশকে নিয়ে বড় সংগ্রহের আশা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ হৃদয় তখনো দাঁড়িয়ে, এক প্রান্তে অবিচল। অন্য প্রান্তে শেষ দিকের ব্যাটসম্যানরা। তাইজুল ও তাসকিনকে নিয়ে প্রতিরোধের দেয়াল গড়েন তিনি।

এই লড়াইয়ের স্বীকৃতি প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের কণ্ঠে, ‘আমরা খেলোয়াড়দের কাছে যেটা চেয়েছিলাম, তারা সেটাই করেছে। আমরা চেয়েছিলাম, তারা যেন সুযোগ কাজে লাগায় এবং যখনই সুযোগ পায়, সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। দলের জন্য যা প্রয়োজন, আপনাকে সেটাই করতে হয়। আজ সে ঠিক সেই মুহূর্তে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে এবং আমরা তার কাছে যা চেয়েছিলাম, সবকিছুই করেছে।’

বিশেষ করে শেষ দিকের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে হৃদয়ের বোঝাপড়া ছিল খুব হিসেবি। কখন স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখতে হবে, কখন সতীর্থকে খেলতে দিতে হবে, কখন বোলারকে আক্রমণ করতে হবে, সবকিছুতেই ছিল পরিণতিবোধের ছাপ। এ নিয়ে সিমন্স বলেন, ‘এটি ছিল অসাধারণ একটি ইনিংস। ফিল্ডাররা বাউন্ডারিতে থাকলেও সে ফাঁক খুঁজে বাউন্ডারি ও ছক্কা মারতে পেরেছে। একপর্যায়ে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে ডাবল সেঞ্চুরির কাছাকাছি যাওয়ার সময়, তার ক্লান্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু সব দিক বিবেচনায় এটি ছিল তার অসাধারণ প্রচেষ্টা। খেলা বোঝা, কোন সময়ে কোন শট খেলতে হবে, শেষ তিন ব্যাটসম্যানকে কখন স্ট্রাইক দিতে হবে, এই ইনিংসে সে সবকিছুই অসাধারণভাবে করেছে।’

যাদের বোলিংয়ে একসময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, সেই বোলারদের একজন জোমেল ওয়ারিক্যানও শেষ পর্যন্ত হৃদয়ের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। চার উইকেট নেওয়া এই বাঁহাতি স্পিনার বলেন, ‘একটা সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ছিল। তখন আমরা ভাবছিলাম, কত রানের লিড নিতে পারব কিংবা লিডটা কত বড় হতে পারে। কিন্তু সে যেভাবে ব্যাটিং করেছে, তা ছিল অসাধারণ। তার এই পারফরম্যান্সের জন্য তাকে কৃতিত্ব দিতেই হবে।’

মিরপুরের ব্যর্থতার পর সিলেটে এমন পরিণত ব্যাটিং কীভাবে সম্ভব হলো? সে প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ বলেন, ‘এই পরিবর্তনের পেছনের রহস্য একমাত্র সেই (হৃদয়) ব্যাখ্যা করতে পারবে। তবে সে পুরো সময়জুড়েই ভালো ব্যাটিং করছে। হ্যাঁ, ঢাকায় সে কয়েকটি অযথা আক্রমণাত্মক শট খেলেছিল। কিন্তু সেটি তার কত নম্বর টেস্ট ম্যাচ ছিল? দ্বিতীয় টেস্ট। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে তাকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। আমার মনে হয়, সে খুব দ্রুত পরিণত হচ্ছে এবং আমরা তার প্রমাণ দেখেছি।’