দেশে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যে ডিসেম্বর ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অনেকেই এখন দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। দিল্লিতে আশ্রয়ে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরই শুরু হয়েছে এই অস্থিরতা। আরেক দফা অত্যাচার-নির্যাতনের মুখে পড়তে পারেন এ আশঙ্কা এখন পেয়ে বসেছে আওয়ামী লীগের একাংশকে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পর দলীয় অনেকে এখনো দেশে আছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি দলের নানা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে। তারা মনে করছেন দলীয় নেত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণার পর এই সম্পর্কের অবনতি হবে।
সারা দেশে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থক ও অনুসারীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে থাকা অংশটি ঝামেলামুক্ত থাকতে চায়। হামলা-মামলা, জেলজুলুম-হুলিয়া মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকতে অনীহা তাদের। দলীয় সভাপতির দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও নতুন করে কোনো ঝুঁকির মুখে পড়তে চান না তারা। এই অবস্থায় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াকে আপাতত নিরাপদ মনে করছে তারা।
আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতারা মনে করেন, ডিসেম্বরে তাদের দলের সভাপতি যদি আসলেই দেশে ফিরে আসেন তাহলে হয়তো রক্ষা পাবেন তারা, তবে ঘোষণা দিয়ে তিনি না ফিরলে অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাবে। এই সময়ে নতুন কোনো ঝামেলায় জড়ানোর মানে হলো ভবিষ্যতে আরও অন্ধকার ডেকে আনা। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনকেও এ নিয়ে ঝুঁকিতে ফেলতে চান না তারা। তাই দেশ ছাড়ার ফাঁকফোকর বের করার চেষ্টা করছেন। সারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক ও তৃণমূলের নেতাদের কয়েক হাজার চলতি বছরে দেশ ছাড়ার খবর পাওয়া গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের যারা একটু বিত্তবান তারা ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বিভিন্ন দেশে চলে যেতে চেষ্টা করছেন। মধ্যবিত্ত একটি অংশ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পোর্ট এন্ট্রি দেশগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন আওয়ামী একটি অংশের নেতাকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে কারও কারও পারিবারিক চাপও রয়েছে। সবার লক্ষ্য একটাই ঝামেলামুক্ত থাকা। তবে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা সত্যি দেশে ফিরে এলে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার ফিরে আসবেন এমন কথাও জানিয়েছেন অনেকে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে বাইরে চলে যাওয়া নেতাকর্মীদের একটি অংশ দেশে ফেরার প্রস্তুতির নিচ্ছে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয়ে থাকা তৃণমূলের কিছু নেতা চুপেচাপে দেশে ঢুকেছেন বলেও দলীয় সূত্র জানিয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়া বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ভারতে এসে জড়ো হচ্ছেন ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা উপলক্ষে। তারা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভারতে ফিরতে শুরু করেছেন।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডীলর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নভেম্বরের শেষভাগে আওয়ামী লীগের সব নেতাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। মামলায় যেসব নেতার সাজা হয়ে গেছে তাদের শেখ হাসিনার সঙ্গে ফেরার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি। মামলা হয়েছে সাজা হয়নি সেসব নেতাদের দেশের বাইরে থাকতে কড়াভাবে মানা করে দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
সম্পাদকমণ্ডলীর এ নেতা আরও বলেন, এরই মধ্যে চুপেচাপে অনেকেই দেশে ফিরেছেন। তবে দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন তারা। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সবুজসংকেত পাওয়া মাত্রই আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে বের হবেন তারা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে থাকতে শুরু করেছেন। যাতে সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা দেশে ঢুকে যেতে পারেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য নামপ্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সত্যিকার অর্থে দেশের পরিস্থিতি যে জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জন্য দেশে থাকা একেবারেই অনিরাপদ। তারপরও যারা আছেন, গত আড়াই বছর তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আছেন। তবে এখন সে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাও দেশে ফিরবেন ডিসেম্বরে। ফলে এখন দেশ ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া দলের যেকোনো নেতাকর্মীর জন্য অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, এখন দেশ ছাড়ার সময় নয়, বরং যারা বাইরে আছেন তাদের দেশে ফিরে লড়াই-সংগ্রাম করার সময় এসেছে।