সব যড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব দেব : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪১ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা সব ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব দেব। গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘সার্বভৌমত্ব’ র‌্যালিপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো আবারও দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। আজকে ৭ নভেম্বরের সার্বভৌমত্ব র‌্যালি হোক আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দিন। আজকের এই র‌্যালি হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার দিন। বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট  যে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি হোক গণতন্ত্র রক্ষার দিন।’

দিবসটি উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চ থেকে বিকেল ৩টায় শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে হেঁটে এতে অংশ নেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে গিয়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। পুরো ৮ মাইল পথই তিনি হেঁটে যান।

বর্ণিল সাজে সজ্জিত শোভাযাত্রায় কয়েক লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক অংশ নেন। দুপুর ১২টা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে সমবেত হতে শুরু করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থকের ঢল নামে।

নেতাকর্মীদের হাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরে তারা শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

শোভাযাত্রার উদ্বোধনী মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনেনি, দেশের মানুষ স্বৈরাচার ও ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টও একইভাবে দেশের মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে। অতীতের মতো এখনো তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আবারও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দাবিয়ে রাখতে চায়। তারা আবারও ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়।’

তিনি বলেন, যে দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করতে পারে, যে দেশের মানুষ ১৯৭৫ সালে সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, যে দেশের মানুষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী স্লোগান দেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশসবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের বিশেষ প্রদর্শনীতে যোগ দেন। বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানের শুরুতে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বিশেষ প্রদর্শনী উপভোগ করেন।

অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ‘ভবিষ্যতে কেউ যেন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার হরণ করে বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই হোক এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার।’

তিনি বলেন, ‘এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে হলে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে।’

এ আয়োজনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) তিন হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, তরুণ, বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলাম, তিন বাহিনীর প্রধানসহ, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও অংশ নেন। বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী তার সহধর্মিণীকে নিয়ে মাঠ ঘুরে গ্যালারিতে বসে থাকা শিক্ষার্থী ও অতিথিদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।

গতকাল যথাযথ মর্যাদায় দেশব্যাপী পালিত হয় ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি আয়োজনের পাশাপাশি রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সংগঠন। রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন, সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ প্রদর্শনী ছিল উৎসবমুখর।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছিলেন। টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বর্ণাঢ্য র‌্যালিতে নেমেছিল জনতার ঢল।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা : ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দিনের শুরুতে সকাল সাড়ে ৮টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতাকর্মীদের নিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ একা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে তিনি ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। দুপুরে দুই নেতার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া দুই নেতার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করেন।

ঢাবিতে আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী : আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মিলাদ-মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে আলোচনা সভা এবং টিএসসি প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও গুরুত্বপূর্ণ ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।

আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যহীন, সমৃদ্ধ, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন দেশ গঠনে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত নস্যাৎ করেছিল। দিবসটি ব্যক্তি-স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা দেয়। তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের ধারণা সামনে এনেছিলেন। ৭ নভেম্বরকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত