একা হলেও লড়াইটা অব্যাহত রাখতে হবে

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২১, ১০:৩৭ পিএম

মানুষে মানুষে যোগাযোগ, সম্পর্ক, যৌথ জীবনযাপন, সমবেত লড়াই ইত্যাদি ইত্যাদি যে একটা জটিল সমস্যাপূর্ণ বিষয়, তা মনোবিশ্লেষক, ভাষাবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা যুগে যুগে টের পেয়েছেন, এখনো টের পাচ্ছেন।

‘মানুষ মূলত একা’ এ এক গভীর দার্শনিক অভিজ্ঞতা। অনেকেই দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলেন, পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ এক-একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। পথ যা, তা একাই পাড়ি দিতে হয়। ঘুমহীন রাতগুলো একাই পার করতে হয়। হারতে থাকা যুদ্ধগুলোও লড়তে হয় একা একাই। দিনশেষে আলো-আঁধারির ফুটপাতে একা বসেই ভাবতে হয় একান্ত কিছু বিচ্ছিরি অনুভূতির কথা। সবকিছুর শেষে মানুষ আবারও উঠে দাঁড়ায়, বাঁচে আরও কিছু একা মানুষের জন্য।

একা, একাকিত্ব এটা একটা অনুভূতি। অনেকে আবার বলেন, আধুনিক মানুষের রোগ। হয়তো বাস্তবতাও। কিন্তু মানুষ কি একা লড়াই করতে পারে? একা লড়ে বাঁচতে পারে? আপাত আমরা তো সংঘবদ্ধভাবেই বাস করি। সমাজে সংসারে অনেকের সঙ্গে মিলেমিশেই আমাদের বেঁচে থাকা। কিন্তু এ যৌথ সমাজেই কিন্তু একা থাকার, একা বাঁচার, একলা লড়াইয়ের ঘটনাগুলো বাড়ছে। যদিও আমরা এই ব্যক্তিগত লড়াইয়ের ঘটনাগুলো খুব একটা দেখি না, দেখতে চাই না। কেননা যারা একা থাকেন তারাও শেষ বিচারে কোনো যৌথতার প্রতীক্ষাতেই থাকেন। কতটা অন্তহীন অপেক্ষা এরা করতে পারে, অসহ্য দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও কতটা আশায় এরা দিন গুনতে পারে, নিজেদের একার লড়াইটা কত দূর অবধি এরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে সেটা বোঝা বা উপলব্ধি করাটা আমাদের অনেকের সাধ্যেরই বাইরে।

সমাজ-সভ্যতানিরপেক্ষভাবেই ব্যক্তির একটা দায় থাকে ব্যক্তি হয়ে ওঠার, সে নিজেই নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে-দায় কাঁধে তুলে নেয়। বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আত্মপ্রতিরোধের ভেতর দিয়ে তার অভিপ্রায়ের দিকে সে এগিয়ে চলে। ভুল হোক, ঠিক হোক, যত তুচ্ছ বা সামান্যই হোক, ব্যক্তি তার লড়াইটা অব্যাহত রাখে। মুশকিল হলো, আমাদের পঞ্চাশ-ছোঁয়া স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকেই তো সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত পরিচয়টাকে একমাত্র আত্মপরিচয় ঠাউরেছি আমরা। দীর্ঘ পরাধীনতা আমাদের আত্মপরিচয় অর্জনের প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে ফেলেছে, স্বাধীনতার জন্য সমষ্টির জাগরণ এতটাই বড় হয়ে উঠেছিল যে, ব্যক্তি হয়ে-ওঠার চেষ্টা সেভাবে করিনি আমরা। নাগরিক বলে দাবি করি বটে নিজেকে, ব্যক্তি হয়ে-ওঠার মতো, ব্যক্তিকে বোঝার মতো নাগরিক-মনটাই নেই আমাদের।

ব্যক্তির ভেতর যে রহস্যময় মানুষটা বাস করে, তার মনের মধ্যে যে চড়াই-উতরাই, তা প্রায় কখনোই ধরা পড়ে না আমাদের চোখে। আমরা যে ব্যক্তিকে নিয়ত দেখি, একটা গড় চেহারা ফুটে ওঠে তার মধ্যে। সেই গড় চেহারার মানুষটির জীবনে কোনো ব্যক্তিগত সংকটই তাকে ব্যক্তিগতভাবে তত বিপন্ন করে না, যাতে বেদনায়-বিষাদে সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হয়ে ওঠে। আমরা ব্যক্তিগত পরিসর বা প্রাইভেট স্পেস জিনিসটার গুরুত্বই অনেকে বুঝি না। ব্যক্তিগতভাবে বাঁচতে চাওয়া, নিজের লড়াইটা নিজেই লড়া এটাও আমরা বুঝতে চাই না। কিন্তু শেষ বিচারে লড়াইটা তো প্রত্যেক মানুষের একার। সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর হওয়া সত্ত্বেও আমরা তো আসলে একা।

আমাদের বেঁচে থাকার সমাজ-মুখাপেক্ষী ধরন-ধারণ, রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। বিপন্নবোধ করলেই চট করে আমরা সমষ্টিতে লগ্ন হতে চাই, চেনা বৃত্তের খোঁজ করতে থাকি।

কিছু হলেই নিদান দিই, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধবদের ডেকে আনুন, সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকুন। নিজেদের চেনা-জানার বাইরে পৃথিবীটাকে ভাবতেই পারি না আমরা! আমরা যারা সমাজ বদলের কথা বলি, তারা কজন পেরেছি পরিবারের ঊর্ধ্বে যেতে? আগে পরিবার তারপরে তো একটি সমাজ; কজনের পরিবারে সাবলীলভাবে অপরের স্থান হয়? বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা বেশির ভাগই পরিবারকে বদলাতে পারিনি, সমাজ তো ঢের দূরের!

হ্যাঁ, আমরা যারা খুব কাছ থেকে দেখেছি, সারা দিনে একজন শ্রমিকের গা থেকে কতটুকু ঘাম ঝরে, আমরা কি শ্রমিককে কয়েকটা বেশি টাকা দিতে রাজি? একজন রিকশাওয়ালাকে আমরা কয়জন বাড়তি টাকা দিতে প্রস্তুত? অথচ এই আমাদের কাছেই না শ্রমিকের ঘামের গন্ধ কত চেনা! আমরা জানি কতখানি ঘাম ঝরালে এক দিনের ভাতের জোগাড় করা যায়। আমরা জানি, এক দিন অসুস্থ থাকলে একজন খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে কতটা অসহায়ত্ব নেমে আসে। তারপরও কী আমরা কেউ এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি?

অথচ আমরা অনেকেই একসময় ছাত্ররাজনীতি করেছি। নিজেদের প্রগতিশীল পরিচয় দিতে এখনো ভালোবাসি এবং গর্ববোধ করি। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বিভিন্ন বক্তৃতায় অংশ নিই। প্রগতির কথা বলি। আসলে কীসের প্রগতি? নাকি স্রোতে গা ভাসানো? কোথায় আমাদের প্রগতিশীলতা? যারা এখনো জীবন-সংগ্রামের একাকী যোদ্ধা তাদের আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করি? কতটুকু সংবেদনশীল তাদের প্রতি?

যে মানুষটি আমাদের দেখানো পরিবর্তনের পথের সাঁকোটিতে একদম একা টলতে টলতে সামনে চলতে শুরু করেছেন, সেই সাঁকোগুলো সব ঘুণে ধরেছে, খুলে পড়ছে, এ সাঁকো পেরোতে গেলে হয়তো তাকে পড়ে যেতে হবে, তা না হলে সাঁতার কাটার প্রস্তুতি নিয়ে ঝাঁপ দিতে হবে অগাধ পানিতে।

সেখানেও সে একা! কে কার খোঁজ নিতে পারি আমরা? কারও অসুস্থতা, কারও অভাব, কারও অনটনের? শেষ বিচারে উদারতা দেখিয়ে আমরা কেউ কারুর খাবার কিংবা জীবিকার ব্যবস্থা করি না, চিকিৎসা করাই না, ব্যাগে টাকা আছে কি না সে খোঁজ নিই না! শেষ পর্যন্ত আমরা লড়াই করে যাই একা, নিজের জন্য নিজের অস্তিত্বের জন্য। এই লড়াইয়ের কোনো সঙ্গী নেই। যে করে শুধু সেই বোঝে। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। নিজস্ব দৃঢ়তা, সাহস ও অসহায়তা সম্বল করে।

আসলে আমাদের পৃথিবীটা বদলে গেছে। বিশ্বজুড়ে একটা বৃহৎ স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে। বদলে গেছে অনেক কিছু। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি, বিশ্বায়ন, কিছুই মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকাকে নির্ভরতা দিতে পারেনি; উল্টো কঠিনতর করেছে। আর আমাদের দেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, বৃহৎ দুই দলের খেয়োখেয়ি, এখন একদলের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব সব ক্ষেত্রেই তৈরি করেছে মধ্যমেধার দাপট। স্বাধীনতার পর বামনাকৃতির যে স্বপ্ন দেখার শুরু, দিনকে দিন তা আরও ক্ষুদ্র হচ্ছে।

খরা আর হতাশা শুধু রাজনীতিতে নয়, সবখানে। খরা মেধা-মননে, খরা সংস্কৃতিতে, সংস্কৃতিচর্চায়। ‘নীল সোফাসেটে বসে মিঠে খুনসুটি’ ছেড়ে মঞ্চে আসছে না কোনো মৌলিক নাটক। এমনকি হ্যামলেট, কিং লিয়র, ম্যাকবেথ, ওথেলো, জুলিয়াস সিজার, রোমিয়ো জুলিয়েট, কিংবা ওথেলোও মঞ্চায়ন হচ্ছে না। এ মুহূর্তে শেকসপিয়ার চর্চা বড় বেশি প্রয়োজন, কেননা ওই চরিত্রগুলো বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। শেকসপিয়ারের বেশ কয়েকটি নাটকে এমন কিছু মানুষকে আমরা ‘জোট’ বাঁধতে দেখি, যাদের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কোনো মিলই নেই। কিন্তু, কীভাবে যেন ‘ঠিক-বেঠিক’-এর সীমাটা গুলিয়ে যায়, ন্যায়নীতির বোধকে গ্রাস করে ক্ষমতালিপ্সা, প্রেমকে ঢেকে দেয় ঈর্ষা। ম্যাকবেথের ভেতর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা ক্ষমতালিপ্সাকে জাগিয়ে তোলে লেডি ম্যাকবেথ। ব্রুটাসের স্বদেশপ্রেমকে ভুল পথে চালিত করে ক্যাসিয়াস, ওথেলোর ভেতর ইয়াগো পুরে দিতে সমর্থ হয় সর্বনাশা ঈর্ষার বিষ। আরও বহু স্তর রয়েছে চরিত্রগুলোর, যা নানাভাবে ভাবায়, প্রেরণা জোগায় সময়কে বিশ্লেষণ করতে। আমাদেরও আজ সময়কে, একই সঙ্গে নিজেদের ভূমিকাকে, বিশ্লেষণ করাটা বড় বেশি জরুরি!

তাহলে কী করতে হবে? এ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমার, আপনার দায়িত্ব কী? বলাবাহুল্য, সত্য বলা এবং প্রশ্ন করা, যে প্রশ্ন অস্বস্তিতে ফেলবে ক্ষমতালোভী মানুষদের। আর এসব কিছুর বিনিময়ে আমরা কী পাব? সুশাসন, ক্ষমতার পরিবর্তন, বিপথগামীদের সুপথে ফেরার প্রত্যাশা? হয়তো কিছুই নয়। তাহলে কী পাব? পাব সেই শক্তি ও সামর্থ্য, হেনরিক ইবসেন-এর নাটকের নায়ক ড. স্টকম্যান যা পেয়েছিলেন : ‘পৃথিবীর সফলতম মানুষ হলেন তিনি, যিনি সবচেয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকেন।’

এখানেই শেষ নয়। রয়েছে আরও একটি মহাসত্য : ‘তুমি সত্যের জন্য লড়াই করছো, এবং সেই কারণেই তুমি একা। এটা তোমাকে সবল করে। আর যে সবল তাকে একা হতে শিখতেই হবে।’ একা হওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে সম্ভবত একজন বিবেকবান প্রতিবাদী নাগরিকের আর কিছু পাওয়ার নেই!

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত