সুস্থ-সবল, সুঠাম দেহ কে না চায়? আবার স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ ঢের খাটাখাটুনি করে, নিজের দেহ নিয়ন্ত্রণে রাখে। সব মানুষ নিজের পেশায় বা ব্যবসায় সফল হতে; বহু রাত বিনিদ্রায় ভোর হয়ে; সূর্যের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে আলিঙ্গন করে। পরিবার, সন্তানদের সুনিশ্চিত সুন্দর ভবিষ্যতে জন্য কত কিছুই না করে। কিন্তু আত্মা পাপের ধুলোয় মলিন হলে; অনুশোচনায় সিজদায় দুচোখ কি ছলছল করে? হেরার আলো আত্মার উঠোন কেন ঝলমল করেনি? মনের কোণে প্রশ্ন জাগে? আত্মার সম্পাদনা করার অন্যতম মাধ্যম হলো নিজেকে প্রশ্ন করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের (পরকাল) জন্য কী প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।’ সুরা হাশর : ১৮
আত্মসমালোচনার মানে হলো, নিজেকে প্রশ্নবাণে আবদ্ধ করা, নিজেকে নিয়ে সমালোচনা করা। এটাকে আরবিতে ‘মুহাসাবাতুন নাফস’ বলে। যার অর্থ ‘স্বীয় আত্মার হিসাব গ্রহণ করা।’ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুজাহিদ সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য নিজের অন্তরের সঙ্গে জেহাদে লিপ্ত থাকে।’ সহিহ জামে : ৬৬৭৯
আত্মসমালোচনা হলো সুচিন্তিত ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করা কিংবা পরিহার করা। আয়নায় যেমন চেহারা দেখা যায়, ঠিক অনুরূপভাবে নিজের কৃতকর্ম চোখ বন্ধ করে সুস্পষ্ট চিত্র আঁকতে পারেন। অন্যভাবে চিন্তা করলে, নিজেকে নিয়ে তুমুল আলোচনায় লিপ্ত হওয়া। কেয়ামতের দিন অবশ্যই হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত আত্মসমালোচনা করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সেদিন তোমাদের উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো গোপনীয়তাই গোপন থাকবে না।’ সুরা হাক্কাহ : ১৮
আত্মসমালোচনার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের দুর্বলতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে। মুমিনদের ইমান সুদৃঢ় হয়। মানুষ নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে পাবে না। যদি আল্লাহ সাহায্য না করেন। কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্তি থাকার জন্য আত্মসমালোচনার বিকল্প নেই।
আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যখন পরকালের জবাবদিহির উপলব্ধি অন্তরে অনুভব হয়, তখন অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে না। মুমিনের জন্য দুনিয়া হলো কঠোর বিধিনিষেধের। কারণ মুমিনদের জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। অনন্তকালের প্রস্তুতিপর্ব পার্থিব জীবনে খেলতামাশায় মত্ত হয় না। আত্মসমালোচনার মাধ্যমে প্রতিদিনের ভুলগুলো পরিহার করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজ করার মাধ্যমে পরকালের মুক্তির পথ সহজ হয়ে যায়। হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তিকে স্বীয় আত্মার পরিচালক হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আত্মসমালোচনা করতে হবে। যারা দুনিয়ায় আত্মসমালোচনা করবে, কেয়ামতের দিন অবশ্যই তাদের হিসাব হালকা হবে। আর যারা এ থেকে বিরত থাকবে, কেয়ামতের দিন তাদের হিসাব কঠিন হবে।’ ইগাছাতুল লাহফান
আত্মসমালোচনা দুই পদ্ধতিতে করা যায়। প্রথমত, কোনো কাজ করার আগে চিন্তা করা। কাজটি আল্লাহর দেওয়া মানুষের জন্য মহাসংবিধানের নির্দেশনা কী। মানুষের জন্য কল্যাণকর নাকি ক্ষতিকর? আমলটি কি শরিয়তসম্মত? কাজটি একমাত্র আল্লাহর জন্য হলে একনিষ্ঠ চিত্তে শুরু করা। দ্বিতীয়ত, কাজ করার পর ভাবা। আল্লাহর হুকুমগুলো আদায়ের ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করা। সঠিকভাবে আদায় করতে পেরেছি তো? আরোপিত ফরজগুলো আদায় করেছি? কাজের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা। সংশোধনের পর আবার ভুলের মধ্যে ফিরে না যাওয়ার সংকল্প করা। আল্লাহর নির্দেশিত পথে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
বহু মানুষ অন্যকে দেখে; এক মুহূর্তে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে ফেলে কিন্তু জীবন খেলার শেষ প্রান্তে এসেও নিজেকে সংশোধন করা তো দূরের কথা নিজেকে চিনতেই ব্যর্থ হাজারো মানুষ। জীবন খেলায় বারবার হেরেও অনুশোচনায় কাতর হয় না কখনো। বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে, নিজেই বিচারক হয়ে চোখ বন্ধ করে মনের আয়নায় নিজের কৃতকর্মের চেহারা দেখার অনুভূতি ভুলেও জাগ্রত হয় না। জ্ঞানীরা বলেন, ‘সবচেয়ে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ওই ব্যক্তি, যে নিজের দোষত্রুটি দেখে।’ কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং মানুষ নিজের সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ সুরা কিয়ামা : ১৪
আত্মার উন্নয়নের একমাত্র উপায় হলো আত্মসমালোচনা। নিজেকে দায়িত্বশীল ভূমিকায় দাঁড় করানো। জবাবদিহির কথা মাথায় রেখে কাজ করা। সৎকাজে নিজের দেহ, আত্মা সুপ্রশস্ত করা ও মন্দকাজের নিজেকে গুটিয়ে রাখা। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলাতে চাইলে নিজেকে বদলাও সবার আগে। হজরত উমর (রা.) রাত হলে মাটিতে আক্ষেপের সঙ্গে পদাঘাত করে নিজেকে বলতেন, ‘বলো! আজ তুমি কী করেছো?’